বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ও পরিচালক ইসমাইল হায়দার মল্লিক ক্ষমতা নিজেদের কবজায় রাখতে তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগের নিয়মে পরিবর্তন এনেছিল। তাতে বাছাই লিগে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত মাত্র দুই থেকে তিনটি দল। সেগুলো আবার হতো পাপন-মল্লিকদের অধীনে থাকা নতুন কোনো ক্লাব। ক্লাব ক্রিকেটের নিচের সারির এই করুণ দশায় নতুন খেলোয়াড় উঠে আসার পাইপলাইনটাই বন্ধ হতে বসেছিল। ২০১৩-১৪ মৌসুম থেকে ২০২৩-২৪ মৌসুম পর্যন্ত হওয়া তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগ নিয়ে দুর্নীতি খুঁজতে বিসিবিতে এসেছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট দল। এ ছাড়া গঠনতন্ত্র ও অন্যান্য আর্থিক অনিয়ম নিয়ে থাকা অভিযোগের ব্যাপারেও বিসিবিতে এসেছিলেন তারা।
গতকালের আগে গত ১৬ এপ্রিল মিরপুরে বিসিবি কার্যালয়ে আসে দুদকের আরেকটি এনফোর্সমেন্ট দল। বিপিএলের টিকিট বিক্রির অর্থের হেরফের, মুজিব বর্ষ উদযাপনে বাড়তি ব্যয় ও তৃতীয় বিভাগ বাছাই ক্রিকেট নিয়ে তারা তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে বিসিবিতে গতকাল এসেছে দুদকের অন্য একটি দল। তারা মূলত, তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগে দলগুলো বাছাই প্রক্রিয়া ও বিসিবির গঠনতন্ত্রের ব্যাপারে তদন্ত করবে। তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগ নিয়ে অভিযোগ মূলত বাছাই প্রক্রিয়াতে অনিয়ম নিয়ে। কারণ, ২০১৩-১৪ সালে তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগে এন্ট্রি ফি ৭৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ করার পাশাপাশি স্থায়ী ঠিকানা ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি থাকার দরকার হতো। তবে এই সময়ে তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগ পেরিয়ে ঢাকার বিভিন্ন পর্যায়ে খেলা ১৮টি ক্লাবের কোনোটিরই কাগজপত্র সঠিক ছিল না। উল্লেখ্য যে ১৮ ক্লাবের মধ্যে এখন ঢাকার বিভিন্ন পর্যায়ে আছে ১৫টি ক্লাব। বাকি তিন ক্লাব এখন ঢাকার পেশাদার ক্লাব ক্রিকেটে অস্তিত্বহীন।
দুই কিংবা তিন ক্লাব নিয়ে তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগ আয়োজনে সিসিডিএমের যেসব কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন তাদেরও খুঁজে বের করা হচ্ছে বলেও জানায় দুদক কর্মকর্তা। প্রয়োজনে তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার পরিকল্পনাও আছে বলে জানানো হয়েছে।
নানা অনিয়মের মাধ্যমে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে ঢুকে পড়া ক্লাবগুলো নিজেদের পুরোনো অতীত ঢাকতে ইতোমধ্যে নাম পরিবর্তন ও কমিটি পরিবর্তনের জন্য চিঠি দিয়েছে বিসিবিকে। এই ঘটনার মধ্যে তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগ নিয়ে তদন্ত করতে বিসিবিতে অভিযান চালায় দুদকের এনফোর্সমেন্ট দল। এ নিয়ে তদন্ত দলের নেতৃত্ব দেওয়া দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, ‘থার্ড ডিভিশন কোয়ালিফাইং এই প্রক্রিয়াটা একটা সময় ছিল খুব সহজ ছিল। ইজি অ্যাকসেস। সে সময় ৬০-৭০ প্লাস টিম অংশগ্রহণ করতে পারত। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় ২০২২ এর পর থেকে কিছু বার ক্রিয়েট করা হয়। একটা রেস্ট্রিকশন চলে আসে, সেখানে দুই-তিনটির বেশি টিম পার্টিসিপেট করতে পারে না। সেক্ষেত্রে এটা লেস কম্পিটিটিভ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ন্যাশন্যাল টিমের জন্য খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইনটা খুবই সীমিত হয়েছিল। এই ব্যাপারটায় আমরা বরাবরই ফোকাস করেছি।’
দলগুলোর নাম ও কমিটি পরিবর্তন কেন হচ্ছে এবং কীভাবে মালিকানা পরিবর্তন হচ্ছে সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখবে দুদক। এ ছাড়া ক্লাবগুলোর মালিকানা পরিবর্তনে অর্থের উৎসও খতিয়ে দেখার কাজটিও করছে। মূলত হুট করে এতগুলো ক্লাবের নাম ও কমিটি পরিবর্তন হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে।
এ ছাড়া বিসিবির গঠনতন্ত্র নিয়েও আছে অভিযোগ। এর আগে ২০২৪ সালে গঠনতন্ত্রে নতুন করে পরিবর্তন এনে আরো বিতর্কিত করে তোলেন নাজমুল হাসান পাপন-ইসমাইল হায়দার মল্লিকরা। এই নিয়েও তদন্ত করছে দুদক। গঠনতন্ত্র নিয়ে অভিযোগের ব্যাপারে দুদক কর্মকর্তা রাজু আহমেদ বলেন, ‘বিসিবি যে গঠিত হয়েছে এটা গঠনতন্ত্রের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে। গঠনতন্ত্রটা কতটুকু বৈধ, কতটুকু সিদ্ধ সেই ব্যাপারটাও আমরা আজকে পর্যালোচনা করেছি। আমাদের কাছে অভিযোগ ছিল আমাদের কাছে কিছু অ্যানোমালিজ আছে। আমরা সেই ব্যাপারটা দেখেছি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী খুবই স্ট্রাকচারাল এবং সুন্দর একটা প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল বিসিবি। এখানে আমরা গ্যাপ পেয়েছি।’
তদন্ত কাজের অংশ হিসেবে বিসিবি থেকে বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক। পাশাপাশি এসব কাজে জড়িত থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন তারা। তবে এখনই সব কাগজপত্র ও বক্তব্য গ্রহণের কাজ শেষ হয়নি বলেও জানান দুদকের কর্মকর্তারা। পরে আরো কাগজ ও বক্তব্য নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলেও জানানো হয়েছে। এ নিয়ে রাজু আহমেদ বলেন, ‘নির্দিষ্ট অভিযোগের আলোকে আমরা এখান থেকে রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেছি, সকাল থেকে এই পর্যন্ত বিভিন্ন রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করলাম। বিভিন্ন ব্যক্তিসংশ্লিষ্ট যারা আছে সবার সঙ্গে কথা বললাম, এই অভিযান- আমরা এখনো শেষ করতে পারিনি। কাজ বাকি আছে, আমাদের আরো কিছু রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করব, কিছু বক্তব্য গ্রহণ করব।’
এই দুই অভিযোগের পাশাপাশি বিসিবির ব্যাংক থেকে ২৫০ কোটি টাকা উত্তোলনের পর ২৩৮ কোটি টাকা নতুন করে অন্য ব্যাংকে সরানোর ব্যাপারটি নিয়েও তদন্ত করছে দুদক। কেন অন্য ব্যাংকে সরানো হয়েছে সেটা নিয়েও তদন্ত করছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

