শুধু স্বপ্নই দেখেছে বাংলাদেশ, কাজের কাজ হয়নি

শুধু স্বপ্নই দেখেছে বাংলাদেশ, কাজের কাজ হয়নি

প্রথম ম্যাচে ২২৮। দ্বিতীয় ম্যাচে ২৩৬। দুই ম্যাচেই হার বড় ব্যবধানে এবং টুর্নামেন্ট থেকে আগেভাগে বিদায়। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে যে ধরনের সহজ ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে খেলা হচ্ছে তাতে বাংলাদেশের এই দুই ম্যাচের স্কোরের আগে আপনি একটা শব্দই জুড়তে পারেন মামুলি! ভারত এবং নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে শুধু ব্যাটিংয়ে নয়, বোলিং এবং ফিল্ডিংয়েও এমন মামুলি এবং গড় মানের নিচে থাকা ক্রিকেট খেলেছে বাংলাদেশ দল। দুই ম্যাচের কোনো সময় মনে হয়নি বাংলাদেশ ম্যাচ জয়ের ন্যূনতম সম্ভাবনার কাছাকাছি ছিল। এই দুই ম্যাচের ব্যর্থতাকে আপনি এখন এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনÑ প্রথম পত্রে ফেল, একইভাবে দ্বিতীয় পত্রেও ফেল!

টানা দুই ম্যাচ হেরে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি থেকে বিদায় নেওয়ার পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে প্রশ্নটা শুনতে হলোÑ সমস্যাটা আসলে কোথায়?

বিজ্ঞাপন

অধিনায়কের উত্তরÑ ‘আমরা সিরিজগুলো কিন্তু হোমেই বেশি জিতি। আমরা দেশের বাইরে যে খুব একটা যে বেশি জিতি নিয়মিত, ওইরকম না। আইসিসি ইভেন্টে আমরা কী করে ভালো করতে পারি, এই জায়গায় খেয়াল করতে হবে। আমার মনে হয়, দল হিসেবে প্রত্যেকটি বিভাগে ভালো করা গুরুত্বপূর্ণ। একদিন ব্যাটিং ভালো হচ্ছে ওপরের দিকে, একদিন মাঝখানে ভালো হচ্ছে। একদিন ফিল্ডিং ভালো হচ্ছেৃ মানে এলোমেলো একটা অবস্থা। তাই আমার মনে হয়, কালেক্টিভ একটা পারফরম্যান্স যদি করতে পারি, তাহলেই এই ধরনের টুর্নামেন্ট ও বড় দলের বিপক্ষে জেতা সম্ভব।’

Ñশব্দটা মনে রাখুন কালেক্টিভ পারফরম্যান্স। এবার হিসাব মেলান।

প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে উল্লেখ করার মতো নাম কেবল দুটি। তাওহিদ হৃদয় ও জাকের আলী। তাওহিদ হৃদয় করেন ১০০। জাকের আলীর ব্যাটে রান আসে ৬৮। দলের সাতজন ব্যাটার সিঙ্গেল ডিজিটে আউট। এর মধ্যে পাঁচজনই আবার ফিরলেন শূন্য রানে!

সেই ম্যাচে কালেক্টিভ পারফরম্যান্সের সংকট রয়েই গেল। বাংলাদেশ ম্যাচ হারল ৬ উইকেটের বড় ব্যবধানে। দ্বিতীয় ম্যাচেও সেই একই হাল। দলের ২৩৬ রানের মধ্যে হাফসেঞ্চুরি মাত্র একজনের। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত করলেন ৭৭ রান। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৫ রান আসে জাকের আলীর ব্যাটে। মিডলঅর্ডারে মেহেদি মিরাজ, তাওহিদ হৃদয়, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদÑ এই চারজনের সম্মিলিত সঞ্চয়ের যোগফল মাত্র ২৬ রান!

এই ম্যাচেও অধিনায়কের চাওয়া কালেক্টিভ পারফরম্যান্সের দেখা মিলল না এবং বাংলাদেশ হারল এবারও যথারীতি বড় ব্যবধানে, ৫ উইকেটে। দুই ম্যাচেই বাংলাদেশের এই ব্যাটিং ব্যর্থতায় সবচেয়ে বেশি সমালোচনায় পড়েন দলের সিনিয়র ব্যাটাররা। সৌম্য সরকার প্রথম ম্যাচে শূন্য রান করে পরের ম্যাচে বাদ। মুশফিক রহিমের সংগ্রহ শূন্যের পিঠে ২। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফিরলেন কিন্তু ১৪ বলে ৪ রান তুলে আউট। ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ক্যাচ তুলে ফিরলেন। মুশফিকের আউটের ধরন সেই পুরোনো, স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে ক্যাচ। নিউজিল্যান্ড ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ ফিরলে মুশফিকের বাদ পড়ার একটা আশঙ্কা ছিল। কিন্তু একাদশে মুশফিককে রেখে ব্যাটিং থেকে সৌম্যকে সরিয়ে দেয় বাংলাদেশ। শেষ পাঁচ ওয়ানডের সর্বশেষ তিনটিতে মুশফিকের রান সংখ্যা এমনÑ ২, ০ ও ১। তবে কি বাজে ফর্মে থাকলেও সিনিয়ররা কি দলে অটোমেটিক চয়েজ?

সিনিয়রদের প্রসঙ্গে এমন অভিযোগ উঠলে ম্যাচ শেষে তার ব্যাখ্যায় অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত মাস্ট উইন ম্যাচে দলের সিনিয়র ক্রিকেটারের এমন ব্যর্থতার পরও তাদের পক্ষেই তার সমর্থন রাখলেন। তবে সেই সঙ্গে জানিয়ে দিলেন, ‘দলে কেউই অটোমেটিক চয়েজ নয়। সৌম্য ব্যাটিং অর্ডারে ওপরের দিকে ব্যাট করেন, রিয়াদ ভাই লোয়ার মিডলঅর্ডারে নামেন। যদি একাদশে সৌম্যকে রাখতে হতো তাহলে ব্যাটিং অর্ডারে আমাদের অনেক পরিবর্তন করতে হতো। আর এই ম্যাচে রিয়াদ ভাইয়ের খেলাটা জরুরি ছিল, কারণ পেছনের চার বা পাঁচটা ইনিংসে তিনি ভালো ব্যাটিং করেছেন। তাই একাদশে তার (মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ) থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর মুশফিক ভাইয়ের পেছনের পাঁচটি ইনিংস নিয়ে আমি তেমন চিন্তিত নই। কারণ তার কিপিংও তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বছরজুড়ে আমরা দলে তার অবদান দেখে আসছি। তিনি পেছনের তিন ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন তবে আশায় আছি পরের ইনিংসে রানে ফিরবেন। আমি আসলে দলের দুই সিনিয়রকে আলাদাভাবে দেখি না। আসলে আমরা এই দুই ম্যাচে দল হিসেবে ভালো খেলতে পারিনি। তারা সিনিয়র বলে তাদের কাছেই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা থাকবে বিষয়টা এমন কিছু না। বিষয়টি হলো আমরা ব্যাটিং গ্রুপ হিসেবে এই দুই ম্যাচে ভালো খেলতে পারিনি।’

-এই সমস্যার সমাধান কোথায়?

নাজমুল বলেন, ‘যদি বদলের কথা বলে তাহলে আমি খেলোয়াড় বদলের পক্ষে নই। আসলে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। সেই মানসিকতা হলো দায়িত্ববোধের মানসিকতা।’

ভারত ও নিউজিল্যান্ড ম্যাচে দলের ব্যাটাররা সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে ব্যর্থ। শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দল এই সংকট কাটিয়ে উঠবে- এমন প্রত্যাশা করছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলতে যাওয়ার আগে অধিনায়ক নিজেই বলেছিলেন তারা এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হতেই যাচ্ছেন। তবে প্রথম দুই ম্যাচে হার এবং যে ন্যুব্জ ও বেহাল ক্রিকেটের উদাহরণ রেখেছে বাংলাদেশ তাতে অধিনায়কের এই স্বপ্ন এখন ঠাট্টা ছড়াচ্ছে। সেই সমালোচনাকে পাত্তা না দিয়ে অধিনায়ক যুক্তির পথেই হাঁটলেন। বললেন, ‘দলের সব খেলোয়াড়ই এই টুর্নামেন্টে জয়ের স্বপ্ন নিয়েই এসেছিল। আমরা যদি বড় স্বপ্ন না দেখি, তাহলে কীভাবে খেলব? আমরা এখানে কেবল অংশগ্রহণ করতে আসিনি। জিততে এসেছিলাম। ফলাফল হয়তো আমাদের পক্ষে যায়নি। তবে আমাদের দল বড় স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করে। অবশ্য আমরা জানি, শুধু বড় স্বপ্ন দেখলেই চলবে না। সেই স্বপ্ন সফল করতে যথাযথ কাজও করতে হবে।’

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেই কাজটাই করে দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ। আর তাই গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় এবার এই দলের। একটু মনে করিয়ে দিই, আগের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেমিফাইনালে খেলেছিল বাংলাদেশ দল। জি, নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে। এবার সেই দলের কাছে হেরেই গুডবাই!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন