-ক্রুজ শিপ যেখানে আছে সেখানে যাব। জাপানি ড্রাইভার কিছু বুঝতে না পেরে ভালো করে বোঝার জন্য আরেকটু কাছে এলো। মুখে সারল্যের হাসি। দ্বিতীয়বার বললাম তাকে- ক্রুজ শিপ।
আবার তার মুখে সেই শিশুসুলভ হাসি। বুঝলাম এই ইংরেজিতে কাজ হবে না। জাপানি ভাষায় বলতে হবে। ওটা যে আবার আমি জানি না! ভালোই বিপদ। হঠাৎ মনে হলো একটু অন্য চেষ্টা করি।
তুমি পোর্ট চিনো। নাগোয়া পোর্ট? আবার সেই মাথা ঝাঁকুনি! এটাও বুঝছে না সে। নাগোয়া শব্দটা তার পরিচিত। কিন্তু পোর্ট সম্ভবত এবারই প্রথমবারের মতো শুনেছে! হঠাৎই সংকটের সমাধান মিলল।
বললাম- কিনজো পিয়ার চেনো তুমি? এবার তার চোখে বিশ্বাসী উৎসুকের দেখা মিলল। আমার উচ্চারণ শুনে সে প্রতিউত্তুরে যা বলল, সেটা আমার কানে লাগল- গিনজো পিঁয়ে! বুঝলাম সমাধান ডু!
নাগোয়া বন্দরে গিয়ে প্রথম দেখায় যে কেউ একটু থমকে যাবেনই! বলতে বাধ্য হবেন- এত বিশাল! বন্দরের জেটিতে দাঁড়িয়ে বিশাল এক সাদা জাহাজ। এত বড় যে, দূর থেকে তাকালে মনে হয় সমুদ্রের বুকেই যেন আরেকটি শহর ভাসছে। নাম কোস্টা সেরেনা। ২৯০ মিটার দীর্ঘ ইতালিয়ান এই প্রমোদতরী এতদিন ছিল পর্যটকদের বিলাসবহুল ভ্রমণের ঠিকানা। কিন্তু গত বুধবার থেকে এই প্রমোদতরীর সেই পরিচয় বদলে গেছে। এটি এখন এশিয়ান গেমসের অ্যাথলেটদের থাকার জন্য প্রাসাদ। অ্যাথলেট ভিলেজ। সাধারণত কোনো গেমসের ভিলেজ শহরে বা শহরের উপকণ্ঠে হয়ে থাকে। কিন্তু আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে এই ভিলেজ ভাসছে, দুলছে সমুদ্রের কিনারায়! এই প্রমোদ প্রাসাদে পর্যটকের জায়গায় এখন ভিড় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের চার হাজারের মতো অ্যাথলেটের। সেই সৌভাগ্যবানদের তালিকায় বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা আছেন। এই গেমসে অংশ নিতে আসা বাংলাদেশ জিমন্যাস্ট দলের অ্যাথলেটরা ভিন্নধর্মী এক অভিজ্ঞতা নিয়ে এই প্রমোদ প্রাসাদের কক্ষের চাবি বুঝে পেলেন। রাতে রঙিন আলোয় এই প্রাসাদের চাকচিক্য আরো মুগ্ধতা ছড়াল। প্রায় সবাই ক্যামেরায় সময় এবং স্মৃতিকে বেঁধে রাখার আনন্দময় হুড়োহুড়িতে মজলেন।
একদিন মঙ্গলবার সকালে মহাসমারোহে কিনজো পিয়ের জেটিতে এই দাঁড়িয়ে থাকা কোস্টা সেরেনার ‘কমিশনড’হলো। সামুরাই যোদ্ধার সাজ ও নিনজা ফাইটারদের ইয়াহু ভঙ্গিতে আর্ট ফাইটের আমেজ এবং টাইকো ড্রামের আওয়াজ তুলে নাগোয়া জেটিতে এই ‘ভাসমান ভিলেজ’কে এশিয়ান গেমসে স্বাগত জানানো হলো।
লম্বা কিউ এবং অনলাইনের ঝক্কি সামলে রুমের চাবি পেতে খানিকটা দেরি হলেও বাংলাদেশ দলের জিমন্যাস্টরা এই ভাসমান ভিলেজে থাকার আনন্দে ভীষণ কৌতূহলী।
সমুদ্রের দিকে মুখ করা কেবিনে রাত কাটবে। সকালে সেখান থেকেই বেরিয়ে যাবেন প্রতিযোগিতার ভেন্যুতে। দিন শেষে আবার ফিরবেন জাহাজে।
এশিয়ান গেমসে এমন আবাসনের গল্প এবারই প্রথম নয়তো, তবে এত বড় পরিসরে এমন দৃশ্য নিঃসন্দেহে বিরল।
ভাসমান ভিলেজে এই চমকপ্রদ আবাসস্থল এবারের এশিয়ান গেমস শুধু মাঠের লড়াইয়ের গল্প নয়। মাঠের বাইরেও তাহলে চমক ছড়াবে?
১৯ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি প্রিফেকচারের নাগোয়ায় শুরু হচ্ছে ২০তম এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তবে এর মধ্যেই বেশকিছু ইভেন্টের খেলা শুরু হয়ে গেছে। গেমস শেষ হবে ৪ অক্টোবর। ষোলো দিনের এই আসরে অংশ নেবেন ১১ হাজারের বেশি অ্যাথলেট। সঙ্গে থাকবেন ছয় হাজারের বেশি কর্মকর্তা। সব মিলিয়ে প্রায় ১৭ হাজার অংশগ্রহণকারী।
৪৫টি দেশ ও অঞ্চলের পতাকা উড়বে। ৪৩টি খেলায় হবে পদকের লড়াই।
এত মানুষের থাকার ব্যবস্থা করাটাই তাই আয়োজকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেখানেই এসেছে এবারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
এত বড় আসর। অথচ নেই প্রচলিত অর্থে কোনো অ্যাথলেট ভিলেজ। খরচ কমাতে জাপান এবার নিয়েছে অন্য ব্যবস্থা। কেউ থাকবেন হোটেলে। কেউ থাকবেন অস্থায়ী কাঠের কেবিনে। দেখতে অনেকটা কনটেইনারের মতো। আর প্রায় চার হাজার অ্যাথলেটের চার হাজার মানুষ ধারণ করতে পারে জাহাজটি।
একটু ভাবুন দৃশ্যটা। সকালে ঘুম ভাঙল সমুদ্রের পাশে। জানালা খুললেই সামনে পানি। ডেকে হাঁটছেন বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়। সন্ধ্যায় বন্দরের আলো জ্বলে উঠছে। দূরে নাগোয়া শহর। দিনের প্রতিযোগিতার ক্লান্তি শেষে কেউ হয়তো বসে আছেন ডেকে, কেউ ফিরছেন নিজের কেবিনে।
যে জাহাজে সাধারণত মানুষ ছুটি কাটাতে ওঠেন, এবার সেটিই হবে অনেক অ্যাথলেটের অস্থায়ী বাড়ি। আয়োজকদের আশা, মাঠের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এই অভিজ্ঞতাও তাদের মনে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত এশিয়ান গেমসের হিসাব হবে পদকে। কে কত স্বর্ণ পেল, কে কোন রেকর্ড গড়ল, কোন দেশ থাকল তালিকার শীর্ষে। এসবই থাকবে আলোচনায়। কিন্তু নাগোয়ার এই গেমসের সঙ্গে আরো একটি ছবি থেকে যাবে।
রাতের বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা কোস্টা সেরেনা।
জাহাজের ভেতরে তখন হয়তো কোনো অ্যাথলেট পরদিনের লড়াইয়ের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখছেন নিঃশব্দ সমুদ্র।
ভোর হলেই বেরিয়ে পড়তে হবে পদকের লড়াইয়ে। লড়বেন দেশের জন্য। কেউ ফিরবেন জয়ের আনন্দ নিয়ে। কেউ না পাওয়ার গল্প নিয়ে। তারপর আবার রাত নামবে। নাগোয়া বন্দরের কিনজো পিয়ারে নোঙর করা থাকবে সেই জাহাজ।
এবারের এশিয়ান গেমস যার নাম দিয়েছে প্রমোদ প্রাসাদ। এবার তার যাত্রী কোনো পর্যটক নন। এই কেবিনে ঘুমাবে এশিয়ার স্বপ্ন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


