২১ আগস্ট, ২০২৪
সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদকে ডেকে এনে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বললেন, আপনি বিসিবির দায়িত্ব নিন। সভাপতি পলাতক, অনেক পরিচালকও লুকিয়ে গেছে। আপনি বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব নিন। ফারুকের সঙ্গে বিসিবিতে পরিচালক হিসেবে সেই সময়ে দায়িত্ব নেন ক্রিকেট কোচ ও মেন্টর নাজমুল আবেদিন ফাহিম।
২৮ মে, ২০২৫
হেয়াররোডে নিজ সরকারি বাসভবনে ফারুক আহমেদকে ডেকে নেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। বলেন, আপনি কন্টিনিউ করুন এটা আর আমরা চাই না। দায়িত্ব গ্রহণের ৯ মাস পর সরাসরি এমন কিছু শুনতে হবে সেজন্য ফারুক আহমেদ সম্ভবত প্রস্তুত ছিলেন না। তবে দৃঢ়তা রেখে ক্রীড়া উপদেষ্টাকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেন, আমি তো আর যেচে পড়ে বিসিবির চেয়ারে বসে যাইনি। আমি তো কখনোই আপনাকে (ক্রীড়া উপদেষ্টা) ফোন করে বিসিবির সভাপতি হতে চাইনি। আপনারাই ডেকে এনেছিলেন। তাহলে এখন কেন সরিয়ে দেওয়ার কথা উঠছে?
বৃহস্পতিবার দুপুরে ফারুক আহমেদ আমার দেশকে নিশ্চিত করেন, এমন পরিস্থিতিতে তিনি পদত্যাগ করবেন না।
ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে ফারুক আহমেদকে জানানো হলো বিপিএল পরিচালনায় তার কাজে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসন সন্তুষ্ট নয়। বিপিএল শেষ হয়েছে ৭ ফেব্রুয়ারি। আর সেই টুর্নামেন্ট নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা ফারুককে এসে শুনতে হচ্ছে ২৮ মে।
মাঝের এই তিন মাস কি এ নিয়ে অভিযোগকারীরা ঘুমিয়ে ছিলেন? না, তারা বরং বেশ ভালো করেই জেগেছিলেন। কীভাবে কোন দিক থেকে ফারুককে হটানোর জন্য ষড়যন্ত্র পাকানো যায়, সেই সুতা শক্ত করছিলেন তারা দিনরাত জেগে! এখন পাকা সেই পরিকল্পনা করে তারা নাটাই ঘুরাচ্ছেন।
এই তারা কারা?
সহজ উত্তর এরা হলেন বিসিবির পতিত সরকারের রেখে যাওয়া সাত পরিচালক। এদের সঙ্গে ‘ফারুক হটাও’ মিছিলে যোগ দিয়েছেন ফারুকের সঙ্গে বিসিবিতে পরিচালক হিসেবে আসা নাজমুল আবেদিন ফাহিম। এই আট পরিচালক ফারুকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, একনায়কতান্ত্রিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, একক আধিপত্য, দুর্নীতিপরায়ণতা ও ঔদ্ধত্যের অভিযোগ এনে ২৮ মে তারিখে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর বিশাল চিঠি লিখে অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।
একটু জানিয়ে দিই, এই চিঠিতে বিসিবি পরিচালক আকরাম খানের নাম নেই, সই নেই। অর্থাৎ আকরাম খান এই অনাস্থায় বিশ্বাসী নন। অবাক করার আরেকটি বিষয় হলো, ২৮ মের লেখা এই চিঠিতে সই করা নাজমুল আবেদিন ফাহিম ও সালাউদ্দিন চৌধুরী দুজনেই বর্তমানে বিদেশে। নাজমুল আবেদিন ক্রিকেট দলের সঙ্গে লাহোরে এবং সালাউদ্দিন চৌধুরী ব্যক্তিগত কাজে কানাডায়। হতে পারে তারা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে এই অনাস্থাপত্রে সই করেছেন। তবে এই চিঠির সময়কালে একটা বিষয় খুবই স্পষ্ট যে, বিসিবি পরিচালকদের ‘ফারুক হটাও’ আন্দোলন হঠাৎ কোনো বিষয় নয়। এর পেছনে জটিল কুটিল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জড়িত।
৫ আগস্ট বিপ্লব-পরবর্তী একটা শব্দ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত- ফ্যাসিস্টদের দোসর। এই শব্দের ব্যাখ্যাটা এমন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল তারাই এ দোসর। এই ব্যাখ্যার বিস্তারিত বিবরণ জানাচ্ছে যে আটজন পরিচালক বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেছেন সেই তালিকার সাতজন পরিচালক পুরাদস্তুর পতিত সরকারের দোসর।
কারণ আর কিছু নয়, তারা ছিলেন বিসিবির পলাতক সভাপতি ও তার সেকেন্ডম্যান ইসমাইল হায়দার মল্লিকের সহযোগী। যে টেবিলে বসে পাপন ও মল্লিক ‘ক্রিকেটকে খুন’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেই টেবিলের চারধারে এই সাত পরিচালক বসে জি স্যার, জি স্যার করতেন আর হাত কচলে বিগলিত ভঙ্গিতে সব অপকর্মে সায় ও সই দিতেন। পাপন ও মল্লিক পাপের বোঝা কাঁধে নিয়ে পলাতক। আর তাদের দোসররা এখন আরেকবার বিসিবিতে আরেক দফা শাসন ও শোষণের স্বপ্নে মশগুল! পাপন ও মল্লিকের বিরুদ্ধে অর্থপাচার মামলা করেছে দুদক। আর তার পরিচালনা পর্ষদের বাকি দোসররা এখন আরেকবার বিসিবিতে জমিদারি প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত।
সেই তারাই এখন জুলাই বিপ্লবের পর বিসিবির সভাপতি পদে সরকারের মনোনীত সভাপতি ফারুক আহমেদকে হটাতে অনাস্থা এনেছে। বিসিবির পরিস্থিতি এখন যে বিশ্বাসহীনতায় পৌঁছেছে তাতে ক্রীড়া প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে সহজ কাজটা হবে- বর্তমানের পুরো বোর্ড বাতিল করে অ্যাডহক কমিটি দিয়ে বিসিবি পরিচালনা করা। সেই সঙ্গে একটা বিষয় নিশ্চিত করা যে, বাতিল হওয়া বোর্ডের কেউ যেন অ্যাডহক কমিটিতে জায়গা না পায়। নতুন অ্যাডহক কমিটির প্রধান কাজ হওয়া উচিত বিসিবির গঠনতন্ত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা এবং দুই মেয়াদে যারা বোর্ডে ছিলেন তাদের সুযোগ সেখানেই ফুলস্টপ করে দেওয়া। বিসিবিতে লম্বা সময় ধরে কারও জমিদারি প্রথা বন্ধ করতে এর কোনো বিকল্প নেই।
বিশাল বড়বড় নীতিবাক্যে আওড়ে এসে বিসিবির এই চিহ্নিত দোসরদের বিরুদ্ধে এখনো কেন বর্তমান ক্রীড়া প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি? দায়টা অবশ্যই তাদের নিতে হবে। সিদ্ধান্তহীনতা ও অদক্ষতার অন্যনাম!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

