সেমিফাইনালের মঞ্চ প্রস্তুত। আমাদের সামনে এক মহাদ্বৈরথ। সাবেক দুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ও স্পেন মুখোমুখি হচ্ছে। এই মুহূর্তে বিশ্বকাপে আমার নিজ দেশ ফ্রান্স সবচেয়ে ধারাবাহিক, গতিময় ও বিধ্বংসী দল হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে স্পেন ক্যালকুলেটিভ ফুটবল খেলে সেমিফাইনালে উঠেছে। ম্যাচের আগে ট্যাকটিক্যাল এবং দলের শক্তি-দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে আমার কাছে মনে হয়েছে, এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের যে অপ্রতিরোধ্য দল হিসেবে প্রতিটি ম্যাচে অনন্য হয়ে উঠেছে, এই দলটিকে যদি কেউ থামাতে পারে—তবে সেই দলটির নাম স্পেন। আমার কথাটি অনেকের কাছে মনস্তাত্ত্বিক খেলা কিংবা ‘মাইন্ড গেম’ মনে হতে পারে। কিন্তু আমি পরিষ্কার করেই বলছি, এর পেছনে কোনো কিছু লুকানো নেই। নিরেট ফুটবল যুক্তিটাই উপস্থাপন করলাম মাত্র।
অবিশ্বাস্য পাওয়ার ফুটবল খেলছে ফ্রান্স। এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের কাউন্টার অ্যাটাক, তাদের যে গতি, যেকোনো রক্ষণভাগকে স্রেফ উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু তবে গতি স্তব্ধ করে দিতে পারে স্পেন। তাদের দলের সেই সক্ষমতা রয়েছে। কেননা তাদের রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বল পজেশন ও নিখুঁত পাসিংয়ের ‘অস্ত্র’। অনেক সময় ফুটবলের মাঠে কোনো সমীকরণ কাজ করে না। কেননা আপনার পায়ে যতক্ষণ বল থাকবে, প্রতিপক্ষ যতই শক্তিধর হোক, তাতে আপনাকে আঘাত করতে পারবে না। স্পেন এই দর্শনের ফুটবলটাই খেলে। মাঠে তারা অদৃশ্য এক জাল তৈরি করে প্রতিপক্ষকে বলের পেছনে দৌড়ায়। শারীরিকভাবে ক্লান্ত করে ম্যাচে নিয়ন্ত্রণে নেয় স্প্যানিশরা। সব মিলে আমার কাছে মনে হয়, এই মুহূর্তে ফ্রান্সকে হারানোর শক্তি-সামর্থ্য একমাত্র স্পেনেরই আছে। টেকনিক্যাল দিক থেকে ফ্রান্সের চেয়ে স্পেন এগিয়ে। তাদের টিকিটাকা ফুটবলের ঐতিহ্য রয়েছে। তারা যে মানের ফুটবল খেলে, এই মুহূর্তে সেটি বিশ্বের আর কোনো দলের নেই। তবে শারীরিক শক্তির দিক থেকে স্পেনের চেয়ে এগিয়ে থাকবে ফ্রান্সই।
মাঝমাঠ আর আক্রমণে অনন্য ফ্রান্স। এজন্য দলটি বেশি গতিময়। ফ্রান্সের আক্রমণ ভাগকে যদি কোনো সুযোগ দেওয়া না হয়, তাহলে দলের শক্তি অর্ধেক কমে যাবে। আর এই কাজটা স্পেন নিখুঁতভাবে করতে পারে। স্পেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের রক্ষণভাগ আর মিডফিল্ডকেই বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। কেননা স্প্যানিশ মিডফিল্ডারদের চেনা ছন্দ যদি ধরতে না পারেন ফরাসিরা, তাহলে এমবাপ্পেরা বলের জোগান কম পাবেন। আমার মতে, ফ্রান্সকে আটকানোর এটাই বড় কৌশল হবে স্পেনের। তবে ফ্রান্স দলও যেকোনো পরিস্থিতি সামলে অসাধারণ ফুটবল খেলার মানসিকতা আগেও দেখিয়েছে। স্পেনের কৌশল তাদের ভালো করেই জানা। আমি মনে করি, বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ভিন্ন দুটি ফুটবল দর্শনের মহারণ দেখব আমরা। এই ম্যাচে শেষ কথা আমি এটাই বলব, বড় ম্যাচ খেলার যে স্নায়ু চাপ, সেটি ধরে রেখে মাঝ মাঠ যারা দখলে নিতে পারবে, তাদেরই জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে। মাঠের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কৌশলী ফুটবলে কারা জয়ের হাসি হাসবে—সেজন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
লেখক: আর্সেন ওয়েঙ্গার, সাবেক কোচ আর্সেনাল
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

