বাংলাদেশের বড় পুঁজি

মোহাম্মদ ইসামের বিশ্লেষণ

শান্তর ব্যাটিং এবং অধিনায়কত্ব

অস্ট্রেলিয়া সফরে নাজমুল হোসেন শান্তর কাছে বাংলাদেশের চাওয়া অনেক কিছু। গত দেড়-দুবছরে তার ব্যাটিং ফর্ম আর বাস্তববাদী নেতৃত্বই দলটিকে টেস্টে এগিয়ে নিয়েছে সবচেয়ে বেশি। দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ের চোটের কারণে এ সফরে বাংলাদেশের পরিকল্পনা কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুই টেস্টের এই সিরিজে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ভরসা করতে হচ্ছে মূলত দুটি জিনিসের ওপর। আর সেই দুটি বিষয় হলো, নাজমুল শান্তর ব্যাটিং এবং তার অধিনায়কত্ব। দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দ্বিতীয়বারের মতো টেস্ট সিরিজ খেলতে এসেছে বাংলাদেশ।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রস্তুতি ম্যাচ থেকে মোটেও কোনো সুখকর খবর পায়নি বাংলাদেশ। ডারউইনে ১৩ আগস্ট শুরু প্রথম টেস্ট। আর আগে সিরিজের একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচটিই বাংলাদেশ হেরেছে ইনিংস ও ৩৮ রানে। তৃতীয় দিন সকালে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা বলে দেয়Ñব্যাটসম্যান আর অধিনায়ক দুই ভূমিকাতেই শান্তর সামনে কাজ পড়ে আছে অনেক।

বিজ্ঞাপন

প্রস্তুতি ম্যাচে শান্ত নিজে করেছেন ৩৭ ও ০। তবে টেস্ট সিরিজে দলের ব্যাটিং অনেকটাই নির্ভর করবে গত দেড় বছর ধরে তিনি যে ফর্মটা বয়ে বেড়াচ্ছেন, তার ওপর। চার নম্বরে খেলা শান্তর স্বাভাবিক খেলাটাই আক্রমণাত্মক; কিন্তু টপ অর্ডারের নড়বড়ে অবস্থার কারণে প্রায়ই তাকে নিজের খেলাটা একটু গুটিয়ে নিতে হয়।

গত তিন বছরে বাংলাদেশ পাঁচ জোড়া ওপেনার বদলিয়েছে, কোনো জুটিই স্থায়ী হয়নি। ফলে নতুন বলের বিপক্ষে মুমিনুল হকের সঙ্গে মিলে মাঝেমধ্যে আগুন নেভানোর কাজটিও করতে হয়েছে শান্তকে; তারপর যেতে হয় নিজের চার নম্বরের দায়িত্বে। অস্ট্রেলিয়ায় অবশ্য একটি জায়গায় তিনি ভরসা পেতে পারেন, মিডল অর্ডারে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে তার বড় জুটির অভিজ্ঞতা আছে। লিটন দাসের দলে ফেরাও উইকেটের পেছনে আস্থা আর মিডল অর্ডারে বাড়তি শক্তি ও সাহস জোগাবে।

তবে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শান্তর নেতৃত্ব, মাঠে আর মাঠের বাইরে দুই জায়গাতেই।

মুশফিকুরকে টপকে সম্প্রতি বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল টেস্ট অধিনায়ক হয়েছেন শান্ত ১৯ টেস্টে ৮ জয় নিয়ে, যেখানে মুশফিকুরের ৭ জয় এসেছিল ৩৪ টেস্টে। গত তিন বছরে বিশ্বজুড়ে অধিনায়কদের মধ্যে জয়ের হিসাবে শান্তর অবস্থান সেরা পাঁচের মধ্যে। শুধু রেকর্ড ভাঙাই নয়, দল চালানোর ধরনেও তিনি নিজের একটি ছাপ রেখেছেন।

শান্তর আগে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে টেস্টে নেতৃত্ব দেওয়া একমাত্র অধিনায়ক ছিলেন খালেদ মাহমুদ, যিনি শুরু থেকেই শান্তর পরিচর্যা করে আসছেন এবং ২০২৩ সালে তার অধিনায়ক হওয়ার পেছনেও ভূমিকা রেখেছিলেন। মাহমুদের ভাষায়, মাঠের বাইরে শান্ত পুরোপুরি শান্তই; কিন্তু মাঠে নামলেই তিনি বদলে যান আক্রমণাত্মক এক চরিত্রে। জেতার তাগিদ থেকেই সাহসী সিদ্ধান্ত নেন, সতীর্থদের ওপর ভরসা রেখে ছোট সংগ্রহ নিয়েও ঝুঁকি নিতে পিছপা হন নাÑপাকিস্তানের বিপক্ষে সেই আলোচিত সাহসী ডিক্লেয়ারেশনও তার প্রমাণ।

মাহমুদের পর্যবেক্ষণ, অধিনায়ক হওয়ার পর শান্ত অনেক বেশি দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছেন, ক্রিকেট নিয়ে ভাবনাটাও গভীর হয়েছে। মজা করে তিনি প্রায়ই শান্তকে বলেন, ক্রিকেট নিয়ে একটু বেশিই ভাবছেন তিনি। জবাবে শান্ত বলেন, খেলার ভেতরেই ডুবে থাকতে ভালো লাগে তার।

মাহমুদের মতে, মাঠের নেতৃত্বের বাইরেও ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের খেয়াল রাখার কাজটি শান্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই করেন। সতীর্থরা কে কেমন আছেন শারীরিক বা মানসিকভাবে, সেই খোঁজ তিনি রাখেন, এমনকি তাদের কাছে না থাকলেও। ‘ক্রিকেটই তার কাছে সব’Ñবলেন মাহমুদ। তবে সতর্কও করেছেন, ব্যাটসম্যান হিসেবে রান না পেলে তার অধিনায়কত্বের মূল্যও কমে যাবে, ঠিক যেমনটি নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে বেশি ভাবতে গিয়ে তিনি নিজেও ভুগেছিলেন।

বিসিবির সিনিয়র কোচ সোহেল ইসলাম, যিনি লম্বা সময় ধরে শান্তর সঙ্গে কাজ করেছেন, তিনি বলেছেনÑঅধিনায়ক হিসেবে শান্ত সতীর্থদের এমনভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ড্রেসিংরুমের পরিবেশটাই এখন অনেক স্বস্তির। প্রয়োজনে দলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার সাহসও তার আছে বলে জানান তিনি। ‘তার সহজাত সাহসিকতা দলের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে’Ñবলেন সোহেল।

শান্তর আক্রমণাত্মক মানসিকতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এ বছর দেশের মাটিতে পাকিস্তান সিরিজে। টিম ম্যানেজমেন্টের সমর্থন নিয়ে তিনি বিসিবিকে রাজি করান পেস আর বাউন্স থাকা উইকেট বানাতে, বাংলাদেশে যা সচরাচর দেখা যায় না, আর তাতেই চমকে যায় পাকিস্তান। যদিও সে সিরিজে দুই টেস্টেই পাকিস্তানকে কাঁপিয়ে দেওয়া নাহিদ রানা চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়া সফরে নেই।

দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও অধিনায়ক শান্ত বেশ দক্ষ। মুমিনুল আর তাইজুল ইসলামের মতো টেস্ট স্পেশালিস্টদের পাশে থাকেন সব সময়, মুশফিকুরকেও দেন পূর্ণ সমর্থন। নিজের ব্যাটিংয়েও কাজ করেছেন প্রচুর, বিশেষ করে অফস্টাম্পের কাছাকাছি বলগুলোয়। পাকিস্তান সিরিজের প্রথম দিনে ঢাকার ধীরগতির উইকেটে বোলারদের ওপর চড়াও হওয়ার যে পরিকল্পনা তিনি নিয়েছিলেন, তাতেই আসে তার ঝোড়ো সেঞ্চুরি, যা পুরো ম্যাচের সুর বেঁধে দেয়।

অস্ট্রেলিয়ায় শান্তর সামনে কাজটি মোটেও সহজ নয়। দলের সবচেয়ে ফর্মে থাকা পেসার রানা নেই চোটের কারণে, বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলামও চোটের কারণে প্রথম টেস্টে নেই। প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে গুটিয়ে যাওয়াটা যেকোনো অধিনায়কের জন্যই কঠিন এক পরিস্থিতি। তবে কঠিন জায়গা থেকে দলকে টেনে তোলার অভিজ্ঞতা শান্তর নতুন নয়।

অস্ট্রেলিয়ায় সতীর্থরা থাকবেন শান্তর পাশে, আর শান্তও থাকবেন তাদের পাশে। এ সফরে সে ভরসাটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পুঁজি।

লেখক : মোহাম্মদ ইসাম, ক্রিকইনফোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন