সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের চরম সমন্বয়হীনতা, উন্নয়নকাজের পুনরাবৃত্তি ও নাগরিক ভোগান্তি নিরসনে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। অন্তত ২৫টি সরকারি সংস্থার পৃথক সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়হীন কার্যক্রমের কারণে চট্টগ্রাম নগরীর মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রায় ৭০ লাখ অধিবাসী।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, কর্ণফুলী গ্যাস, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা পৃথক সিদ্ধান্তে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। অথচ সমন্বয়হীনতার কারণে তাদের উন্নয়ন কাজে চরম ভোগান্তির শিকার হন নগরবাসী।
নগরবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামকে একটি কার্যকর, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ঢাকার ওপর একক নির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে মেয়রের নেতৃত্বে নগরীর সব সেবা সংস্থাকে একই কাঠামোর আওতায় এনে পূর্ণাঙ্গ ‘নগর সরকার’ গঠনের বিকল্প নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায়ই চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন প্রধান সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি লেগেই থাকে। এতে নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনাও ক্রমশ বাড়ছে। চসিকের মেরামত করা সড়ক এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার খুঁড়ে ফেলছে চট্টগ্রাম ওয়াসা ও বিদ্যুৎ বিভাগ। এছাড়া বন্দরের অতিরিক্ত যানবাহনের চাপেও অধিকাংশ সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে প্রতি বছর রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ কেবল সড়ক মেরামতেই ব্যয় হচ্ছে। সীমিত জনবল নিয়ে অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নেও হিমশিম খেতে হচ্ছে সিটি করপোরেশনকে।
এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে চিঠি চালাচালি বাড়ছে, তৈরি হচ্ছে দূরত্ব ও সমন্বয়হীনতা। পাশাপাশি মেয়রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পগুলোর অনুমোদনও দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে। নগরের সেবা কার্যক্রম ফেলে রেখে দিনের পর দিন রাজধানীতে গিয়ে ফাইল নিয়ে বসে থাকতে হয় সংশ্লিষ্টদের।
নগর সরকার প্রতিষ্ঠা না হলে বর্তমানে প্রস্তুতাধীন সিডিএর মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নও কঠিন হবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। আর এর সবকিছুর চূড়ান্ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের।
জানা যায়, সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিটের স্থানীয় শাসনের দায়িত্ব অর্পণের কথা বলা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী করারোপ, বাজেট প্রস্তুত ও নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে নগরবিদরা বলছেন, প্রতি বছর এসব কাজের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয় সংস্থাগুলোকে। এমনকি করারোপের স্বাধীনতাও নেই চসিকের। অথচ সময় ও অর্থের অপচয় কমাতে বিশ্বের বড় শহরগুলোতে নির্বাচিত মেয়রের অধীনে একীভূত সিটি গভর্নমেন্ট সফলভাবে কাজ করছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিটি গভর্নমেন্ট চালু হলে সব সেবা এক ছাতার নিচে আসার পাশাপাশি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ, নাগরিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সেবার মান ও জনগণের সন্তুষ্টির মাত্রা বাড়ানো সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামই সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কী বলছেন চসিক মেয়র?
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অনুরোধ করার পর তিনি স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। ওই কমিটি একটি কনসেপ্ট তৈরি করে জমাও দিয়েছিল। সেটি দিয়েই নতুন করে কাজ শুরু করা সম্ভব। লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীকে আমি এ বিষয়ে বিষদ ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম।
চসিক মেয়র বলেন, সরকারি সেবা সংস্থাগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে পারলে জনগণ সুফল পাবে। যখনই আমরা রাস্তা মেরামত করি, ওয়াসা পাইপের জন্য আর বিদ্যুৎ বিভাগ খুঁটির জন্য সেগুলো খুঁড়ে ফেলে।
মেয়র বলেন, নগর সরকার থাকলে প্রতি তিন মাস পরপর এর প্রধানের সঙ্গে সব সেবা সংস্থার বৈঠক হবে এবং তারা তাদের কাজের তালিকা দেবে। এরপর নগর সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সবাইকে সেটিই বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি যানজট নিরসন, ফুটপাত দখল উচ্ছেদ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ইত্যাদির উদাহরণ দেন।
চসিক মেয়র বলেন, একাধিক খালে সিডিএ নালা নির্মাণ করেছে, যা চসিকেরও জানা নেই। ফলে সেখানে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। আবার কর্ণফুলী টানেলের ওপারে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তেমন কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। কারণ সেখানে ওয়াসার পানি ও গ্যাস নেই। তাহলে বড় বড় ভবন করে কী লাভ? সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হতে নগর সরকার প্রয়োজন।
নগর বিশেষজ্ঞদের মত
সচেতন নাগরিক কমিটি টিআইবির চট্টগ্রামের সভাপতি ও নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ত্রুটিপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর বাসযোগ্যতা হারাবে।
সরকারিভাবে চট্টগ্রাম নগরীর জনসংখ্যা ৩৩ লাখ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটি ৬০-৭০ লাখ। এত বিপুল জনসংখ্যার শহরে বিভিন্ন সংস্থা আলাদা কার্যক্রম চালালে সেখানে নানা রকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় একই সড়কে বারবার মেরামত, অনিয়ম, অপচয় হয়।
এই নগর বিশেষজ্ঞ বলেন, বন্দরভিত্তিক অতিরিক্ত মানুষের সমাগম ও নাগরিক সেবার চাপ সহ্য করতে হচ্ছে সিটি করপোরেশনকে। শিল্পাঞ্চলের দূষণ ও জলাবদ্ধতা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। অথচ বন্দরের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শহরের ভেতর ও বাইরের অবকাঠামো ও সেবার সমন্বয় অপরিহার্য। সেটিই এখন অনুপস্থিত। বর্তমানে সিটি করপোরেশনগুলোর স্বায়ত্তশাসন অকার্যকর। সিটি করপোরেশন অর্ডিন্যান্স তৈরির সময় এটিকে অতিমাত্রায় মন্ত্রণালয় নির্ভর ও স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী করে ফেলা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) মহাসচিব জিয়া হাবীব আহসান বলেন, চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিতে সব সেবার কেন্দ্রীকরণ করা হলে জনগণ সুফল ভোগ করবে। সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের দ্বৈধতা কমবে, দূরদর্শী সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাবে, মেয়রের ক্ষমতা বাড়বে। জনপ্রতিনিধিরা জনগণের নিকট দায়বদ্ধ থাকবেন। দায় চাপানোর সংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটবে। ফলে সুশাসন নিশ্চিত হয়ে নগরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, উন্নত ও সমন্বিত সেবার একক ও শক্তিশালী কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


