পাবনায় সংগৃহীত পেঁয়াজে অসময়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পচন। জেলার সুজানগর ও চাটমোহর উপজেলায় সনাতন পদ্ধতির চাতাল তো বটেই, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তৈরি আধুনিক সংরক্ষণাগারে রেখেও ঠেকানো যাচ্ছে না এই পচন রোগ। ইতোমধ্যেই দেশি ও হাইব্রিড জাতের সংরক্ষিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বাম্পার ফলন হওয়া সত্ত্বেও অসময়ের এই বিপর্যয়ে উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা।
কৃষকরা জানান, সাধারণত বাংলা কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে সংরক্ষিত পেঁয়াজে পচন ধরা বা অঙ্কুরোদ্গম দেখা গেলেও এবার ভরা আষাঢ় মাসেই এমন বিপর্যয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকেরা।
চাটমোহর উপজেলার সোহাগবাড়ী এলাকার পেঁয়াজ চাষি ফজলু বলেন, এবার ৪০০ মণের মতো পেঁয়াজ রেখেছিলাম। কিন্তু এখনই প্রায় ১০০ মণের বেশি পেঁয়াজে পচন ধরেছে। বাধ্য হয়ে নামমাত্র দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে মণপ্রতি প্রায় হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।
পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে প্রায় ৪০০ মণ দেশি পেঁয়াজ সরকারি সংরক্ষণাগারে রেখেছিলেন সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামের চাষি মনোয়ার পারভেজ মানিক। তবে যথাযথ নিয়ম মেনে সংরক্ষণ করার পরও পচন আটকানো যায়নি। ছত্রাক ও ভাইরাসের সংক্রমণে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি গজাচ্ছে অঙ্কুর।
এদিকে বর্তমানে ভালো পেঁয়াজের বাজার ১৫০০-১৬০০ টাকা মণ হলেও বাজারে সেই কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। এ ব্যাপারে হাজির হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা সদর উপজেলার দোগাছি এলাকার রহিম বিশ্বাস বলেন, ‘১৮০ মণ পেঁয়াজের প্রায় অর্ধেকেই পচন ধরছে। সেগুলো বাজারে আনলে দাম বলছে ৩০০-৪০০ টাকা মণ। সর্বোচ্চ ৬০০-৭০০ টাকা বলছে। কৃষকের বাঁচার আর উপায় নাই।’
সুজানগর উপজেলার কোলাদি গ্রামের কৃষক আকাশ প্রাং বলেন, ‘১৫ বিঘা আবাদ করছিলাম। ফলন হইছে ৮০-১০০ মন। মণপ্রতি হাজার থেকে বারোশত টাকা খরচ পড়ছে। শুরুতে চার থেকে সাতশত টাকা দর থাকায় বেচি নাই। এখন পচে সেই দর পাওয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, অসময়ের এই পচনের পেছনে মূলত অতিরিক্ত হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ চাষ, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দায়ী। বেশি ফলনের আশায় কৃষকরা এবার প্রচুর হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন, তবে এ জাত দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের উপযোগী নয়। পাশাপাশি রোপণ ও উত্তোলনের সময় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বাতাসে আর্দ্রতা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে পেঁয়াজে আর্দ্রতা থেকে যায়। এছাড়া বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আধুনিক সংরক্ষণাগারগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ায় পচনের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
পাবনা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে আট লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৩ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রেকর্ড প্রায় ৯ লাখ ৯৫ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমান মজুত দুই লাখ ৭১ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন। উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণে জেলায় কৃষকদের মাঝে এ পর্যন্ত মোট ৫,৩৩০টি ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’ (বায়ুপ্রবাহ যন্ত্র) বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২,৩৩০টি এবং চলতি বছর অন্যান্য সংস্থা তিন হাজারটি মেশিন বিতরণ করে। তবে এসব যন্ত্রের মাধ্যমে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার কৃষক পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুবিধা পাচ্ছেন, ফলে জেলার বাকি হাজার হাজার সাধারণ কৃষক আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক জানান, উত্তোলন মৌসুমে কয়েকদিন বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পেঁয়াজের প্রাথমিক ক্ষতি হয়। এছাড়া চাষিরা বেশি ফলনের আশায় স্বল্পমেয়াদি হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ চাষ করা, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সংরক্ষণাগারের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়া এবং অনেক কৃষক গাদাগাদি করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করায় এই পচনের মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। তবে ফলনের পরিমাণ অনুপাতে কৃষকের লোকসান হবে না বলেই আমরা আশাবাদী। এখনো যে পরিমাণ পেঁয়াজ মজুত আছে তাতে সংকটের সম্ভাবনা নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


