নিরাপত্তাশঙ্কার কারণে ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে চেয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। ভারতের চাপে বাংলাদেশের এই যৌক্তিক দাবিও মেনে নেয়নি আইসিসি। বাংলাদেশের পরিবর্তে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বৈশ্বিক আসরে জায়গা করে দিয়েছে স্কটল্যান্ডকে। কিন্তু বাংলাদেশের জায়গায় ভারত থাকলে আইসিসির সিদ্ধান্ত পাল্টে যেত। আইসিসির এই দ্বিমুখী নীতির প্রতিবাদে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। চিরবৈরী এই দুই প্রতিবেশীর মহারণের ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল শ্রীলঙ্কায়। পর্যটননির্ভর বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশটি নিজেদের আর্থিক সংকট কাটানোর পথে সহায়ক হিসেবেই দেখছিল ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে। কিন্তু পাকিস্তান বেগে বসায় লঙ্কানরা পড়েছে মহাবিপদে।
পুরোনো বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভারত ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য পাকিস্তানকে অনুরোধ করেছে শ্রীলঙ্কা। বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবে। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই দিয়েছে এমন খবর। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের (এসএলসি) পাঠানো মেইলের প্রসঙ্গটি তুলে ধরবেন পিসিবির চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি। কলম্বোতে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি হওয়ার কথা রয়েছে।
শ্বাসরুদ্ধকর আর হাইভোল্টেজ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মাঠে না গড়ালে আইসিসির সঙ্গে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটও (এসএলসি)। এ কারণে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করতে পিসিবির কাছে চিঠি দিয়েছে লঙ্কান বোর্ড। আগে থেকেই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পাকিস্তানের। এ কারণে লঙ্কানদের অনুরোধ গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করছে পিসিবি। সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতের সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, লঙ্কানদের অনুরোধের পর ভারত ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে শুরু করেছে পাকিস্তান বোর্ড।
পিসিবির সূত্র বলছে, ‘অবশ্যই ক্রিকেটীয় দিক ও সরকার-পর্যায়ে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে পাকিস্তানের। তাই শ্রীলঙ্কা বোর্ডের পাঠানো ই-মেইলটি এভাবে উপেক্ষা করা যায় না। শ্রীলঙ্কা বোর্ডের সভাপতি শাম্মি সিলভা সরাসরি মহসিন নাকভির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কার পাশে থাকা প্রয়োজন পাকিস্তানের। কারণ, পাকিস্তান ও ভারতের ম্যাচ না হলে শ্রীলঙ্কা বোর্ড টিকিট বিক্রি, আতিথেয়তা ইত্যাদি থেকে রাজস্ব হারাবে।’
এর আগে অবশ্য খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট না করার শ্রীলঙ্কার অনুরোধ রাখতে পারছে না পাকিস্তান। সিদ্ধান্তটি সরকারের হওয়ায় ক্রিকেট শ্রীলঙ্কাকে (এসএলসি) ফিরিয়ে দিয়েছে পিসিবি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসকে এসএলসি থেকে চিঠি প্রাপ্তির কথা স্বীকার করেছিল পিসিবির একটি সূত্র। বিষয়টি এখন বোর্ডের হাতে এখন নেই বলে জানিয়েছিল পিসিবির ওই সূত্র, ‘হ্যাঁ, আমরা চিঠিটি পেয়েছি। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্ত তো আমরা বদলাতে পারি না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে।’ তবে এই খবরটি সত্যি নয় বলে জানিয়েছে ওই সূত্র। দেশের বাইরে থাকা পিসিবি প্রধান নাকভি ফিরেই বিষয়টি নিয়ে নাকি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
এর আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত ভেবেচিন্তে ও সুপরিকল্পিতভাবে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে রেখেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। মন্ত্রিসভা বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা একটি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছি- আমরা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলব না। খেলাধুলার মাঠ রাজনীতির জন্য নয়। এই সিদ্ধান্ত খুব চিন্তাভাবনা করেই নেওয়া হয়েছে এবং আমাদের সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো উচিত। এটি একটি যথাযথ সিদ্ধান্ত।’
এসএলসি জানিয়েছে, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্তে আর্থিক ক্ষতি হবে তাদের এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে ২০২২ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে থাকা তাদের পর্যটনশিল্পও। পাকিস্তান বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে না খেললে আইসিসির ক্ষতি প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ছয় হাজার ১২০ কোটি টাকা! ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের প্রতি ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের দাম ২৫-৪০ লাখ ভারতীয় রুপি। উন্মাদনা আর উত্তেজনার পারদে পোড়া এ ম্যাচ মাঠে না গড়ালে চির বৈরী দুই প্রতিবেশী দেশের ক্রিকেট বোর্ড প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০০ কোটি রুপি করে লোকসান গুনবে।
শ্রীলঙ্কার আগে ভারতের বিপক্ষে খেলার জন্য পাকিস্তানকে রাজি করার চেষ্টা করেও পারেনি আইসিসি। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আইনি জটিলতা আর নানা হুমকি দিয়ে আর সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের মামলার ভয় দেখিয়ে টলাতে পারছে না পাকিস্তানকে। এবার পাকিস্তানকে রাজি করাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা।
এর আগে নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিক্ষোভের মুখে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার মতো জঘন্য কাজটি বিসিসিআইকে দিয়ে করায় ভারত সরকার। এ ঘটনার জেরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পুরো দলের নিরাপত্তা শঙ্কায় চিন্তিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিজেদের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে স্থানান্তরের দাবি জানায়। ভারত থেকে নিজেদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার যৌক্তিক দাবি তোলে বাংলাদেশ। এ নিয়ে আইসিসির সঙ্গে তিন সপ্তাহের বেশি সময় আলোচনা ও চিঠি চালাচালি চলে। বাংলাদেশের এই দাবিকে সমর্থন করে আইসিসিকে চিঠি দেয় পাকিস্তান। তাতেও ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে বের হতে পারেনি বিশ্বক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তারা ভারতের প্রভাবে শেষমেশ নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। বাংলাদেশকে বাদ দিয়েই বিতর্ক আর বয়কটের মাঝে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

