স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের রহস্য

স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের রহস্য

বিশ্ব ফুটবলে এখন শুধুই একচ্ছত্র স্প্যানিশ রাজত্ব। অবশ্য ‘আধিপত্য’ শব্দটির নতুন সংজ্ঞা লিখছে স্পেন। জার্মানির বার্লিনে ইউরোপীয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দুই বছরের মাথায় নিউ জার্সির মাঠে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে আবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় তুলেছে ‘লা রোজা’রা। ২০১০ সালে ইউরো জয়ের পরপরই বিশ্বকাপ জেতার যে অনন্য কীর্তি তারা গড়েছিল, ঠিক সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে বর্তমান দলটি।

বর্তমানে পুরুষ ও নারী—উভয় বিভাগেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। ২০২৩ সালে সিডনিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে নারীদের বিশ্বকাপ জয়ের পর, এবার পুরুষ দলও বিশ্বসেরার রূপকথার গল্প লিখল। ফলে ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে একই সময়ে পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভাবনীয় নজির গড়ল স্পেন।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব ও ইউরোপীয় ফুটবলে আধিপত্য

গত পাঁচ বছরে স্প্যানিশ ফুটবলের জয়রথ শুধু এক-দুটি ট্রফিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে শুরু করে বয়সভিত্তিক এবং সিনিয়র পর্যায়ে সব মিলিয়ে রেকর্ড ১৬টি বিশ্ব ও ইউরোপীয় শিরোপা ঘরে তুলেছে তারা। পুরুষ সিনিয়র দল জিতেছে নেশনস লিগ (২০২৩), ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪), অলিম্পিক সোনা (২০২৪), বিশ্বকাপ (২০২৬)। নারী সিনিয়র দল- বিশ্বকাপ (২০২৩), নেশনস লিগ (২০২৪ ও ২০২৫) ট্রফি। বয়সভিত্তিক ও অন্যান্য- অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে একাধিক মহাদেশীয় ও বৈশ্বিক ট্রফিও ঘরে তুলেছে স্প্যানিশরা।

দীর্ঘদিনের বোঝাপড়া

স্পেন দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের বোঝাপড়া। মূল স্কোয়াডের বেশিরভাগ ফুটবলার বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দল বা ক্লাব ফুটবলে একসঙ্গে খেলে আসছেন। এর ফলে মাঠের ভেতরে তাদের বোঝাপড়াটা দারুণ। কে কোথায় পাস বাড়াবে, কার মুভমেন্ট কেমন—এসব বিষয়ে সবাই আগে থেকেই ছিলেন ওয়াকিবহাল। এই দীর্ঘস্থায়ী রসায়ন দলের পারফরম্যান্সে এক অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা এনে দেয়। দারুণ প্রস্তুতি নিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের ছক এঁকেই বিশ্বমঞ্চে পা রেখেছিল লামিনে ইয়ামালরা। সেই মিশনে দারুণভাবে সফল হয়ে বীরের বেশে ঘরে ফিরেছেন উনাই সিমোন-ফেরান তোরেসরা।

দুর্ভেদ্য ডিফেন্স

‘অ্যাটাক আপনাকে ম্যাচ জেতাতে পারে, কিন্তু ডিফেন্স জেতায় শিরোপা’—স্পেন দল এই প্রবাদবাক্যটি পুরোপুরি মেনে চলে। তাদের রক্ষণভাগ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা। ডিফেন্ডারদের শারীরিক শক্তি, ট্যাকল করার নিখুঁত সময়জ্ঞান এবং পজিশনাল সেন্স প্রতিপক্ষের আক্রমণগুলোকে সহজেই নস্যাৎ করে দেয়। সেই সঙ্গে গোলরক্ষকের বিশ্বস্ত পারফরম্যান্স রক্ষণভাগকে আরো দুর্ভেদ্য করে তোলে, যার মূল কারিগর স্প্যানিশ তারকা রদ্রি। স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিলেম বালাগের মতে, এই অভূতপূর্ব উত্থান কেবল ভাগ্যের জোর নয়; বরং একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘সাংস্কৃতিকভাবে আমরা একটি নির্দিষ্ট উপায়ে কাজ করি এবং সবাই এতে বিশ্বাস রাখে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমরা থেমে যাই না।’

কোচের মাস্টারপ্ল্যান

দলের সাফল্যের পেছনে কোচিং প্যানেলের অবদান অনস্বীকার্য। আধুনিক ফুটবলের চাহিদা অনুযায়ী লুইস দে লা ফুয়েন্তে ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন এনেছেন। রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি মাঝমাঠের দখল নেওয়া এবং দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার যে নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট কোচ তৈরি করেছেন, তা মাঠে শতভাগ বাস্তবায়ন করছেন খেলোয়াড়রা। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ফর্মেশন পরিবর্তন এবং সঠিক সময়ে বদলি খেলোয়াড় নামানোর কারিশমা স্পেনের ম্যাচ জয়ের পথকে সহজ করে তোলে।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর লুইস এনরিকে দায়িত্ব ছাড়েন। ফুটবল ফেডারেশন তখন জাতীয় দলের দায়িত্ব দেয় লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাতে। কোনো বড় ক্লাবে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা না থাকায় সে সময় দে লা ফুয়েন্তেকে নিয়োগ দেওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলেই মনে করা হয়েছিল।

তবে সেই সংশয় উড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত কম সময়ে দলকে নেশনস লিগ, ইউরো এবং বিশ্বকাপ উপহার দেন এ ফুটবল গুরু। দে লা ফুয়েন্তের সাফল্যের মূল রহস্য লুকিয়ে ছিল বয়সভিত্তিক ফুটবলে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়। অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ এবং অলিম্পিক দলের কোচ থাকায় বর্তমান দলের অধিকাংশ তারকাকে তিনি একাডেমি জীবন থেকেই চেনেন। সেখানেই গড়ে তুলেছেন দলের মূল ভিত্তি।

হুয়ান মাতা, সাবেক স্প্যানিশ মিডফিল্ডার বলেন, ‘দে লা ফুয়েন্তে একাডেমি থেকেই এই খেলোয়াড়দের চেনেন এবং তারা একটি পরিবার হিসেবে বড় হয়েছে। এটি কেবল বর্তমানের সফল দল নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হওয়া এক শক্তিশালী দল।’

পঁয়ষট্টি বছর বয়সি এই কোচ দলে প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান, কাজের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শান্ত মেজাজ বজায় রাখার সংস্কৃতি তৈরি করেছেন। টানা ৩৮ ম্যাচে অপরাজিত থেকে ইউরোপীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান দলগুলোর ইতিহাসে দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ডও গড়েছে তার দল। বিশ্বকাপ জয়ের পরও খেলোয়াড়দের জয়ের ক্ষুধা এতটুকু কমেনি; তাদের নজর এখন পরবর্তী প্রতিটি ম্যাচের ওপর।

জাতীয় দলের এই অভাবনীয় সাফল্য ক্লাব ফুটবলেও প্রভাব ফেলেছে। পেপ গার্দিওলা ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়লেও প্রিমিয়ার লিগের অন্তত ২৫ শতাংশ দলের ডাগআউটে এখনো স্প্যানিশ কোচদের রাজত্ব দেখা যায়। সঠিক পরিকল্পনা, বয়সভিত্তিক দলের ধারাবাহিকতা এবং নিজস্ব খেলার দর্শনে অবিচল থেকে স্প্যানিশ ফুটবল আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন