গহিন বন থেকে বিশ্বকাপ ফাইনালে

রদ্রি নামের এক ‘শক অ্যাবজরবারের’ গল্প

রদ্রি নামের এক ‘শক অ্যাবজরবারের’ গল্প

গল্পটা ১৬ বছর আগের। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল ছেলেকে অন্তত এক বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হাইস্কুলে পড়াবেন। কিন্তু ফুটবল পাগল ছেলেটির মন পড়ে ছিল মাঠের সবুজ ঘাসে। বাবার ইচ্ছাপূরণ করতে শেষ পর্যন্ত তাকে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হয়েছিল ঠিকই, তবে সেটা রদ্রির নিজের ভাষায় ছিল ‘ভুল সময়ে’।

বিজ্ঞাপন

তখন ২০১০ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকায় চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ। আর ১৪ বছরের কিশোর রদ্রি তখন স্পেনের মাদ্রিদ থেকে হাজার মাইল দূরে কানেটিকাটের এক গহিন বনের গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে। চারদিকে শুধুই গাছপালা, টেলিভিশনের কোনো নামগন্ধ নেই। স্পেনের কোনো ম্যাচই দেখতে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে এক ক্যাম্প অনেক অনুরোধের পর ক্যাম্পের কাউন্সেলরের কম্পিউটারে দেখার সুযোগ পান আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার ফাইনালের সেই মহাকাব্যিক গোল। সেই এক গোলের আনন্দই বদলে দিয়েছিল কিশোর রদ্রির পৃথিবী।

আজ ১৬ বছর পর ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা! সেই যুক্তরাষ্ট্রেই বসেছে বিশ্বকাপের আসর, আর সেই গহিন বনের কিশোর রদ্রিই এখন বিশ্বমঞ্চে স্পেনের অধিনায়ক। মাঝখানে কেটে গেছে অনেক সময়; পড়াশোনা শেষ করে নিয়েছেন ব্যবসায় প্রশাসনে ডিগ্রি, ফুটবল মাঠে জিতেছেন ব্যালন ডি’অর। কিন্তু এবার তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় নন, স্প্যানিশ আর্মাডার সবচেয়ে বড় ভরসার প্রতীক।

অটোমোবাইল বা গাড়ি নির্মাণ শিল্পে একটি শব্দ খুব পরিচিত—‘শক অ্যাবজরবার’। রাস্তায় যতই ঝাঁকুনি বা গর্ত থাকুক, ভেতরের যাত্রীদের তা টের পেতে দেয় না যে যন্ত্র। ফুটবল মাঠে রদ্রির ভূমিকাও ঠিক তা-ই। রক্ষণভাগের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের সব আক্রমণ তিনি নিজের বুকে শুষে নেন, স্পেনের রক্ষণদুর্গে কোনো ঝাঁকুনিই পৌঁছাতে দেন না।

অথচ মাত্র ২২ মাস আগে এক মারাত্মক এসিএল চোটে পড়ে ক্যারিয়ারই হুমকির মুখে পড়েছিল তার। এই চোটের আগে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ট্রেবল জয় ও টানা ৭৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছিলেন। চোট কাটিয়ে এই বিশ্বকাপে যেভাবে তিনি মাঠে ফিরেছেন, তা যেন সেই চেনা অপ্রতিরোধ্য রদ্রিরই রাজকীয় পুনর্জন্ম।

সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সের বিপক্ষে রদ্রি যা করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসে রূপকথা হয়ে থাকবে। লাপোর্ত ও কুবার্সিকে সঙ্গে নিয়ে স্প্যানিশ বক্সের সামনে তিনি যেন এমন এক ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’ তৈরি করেছিলেন, যেখানে এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের অলঙ্ঘনীয় আক্রমণভাগ বারবার এসে নিখোঁজ হয়ে গেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, সেমিফাইনালের রদ্রি বল দখলে (ডুয়েল) ১৫টি লড়াইয়ের ১১টিতেই জয়ী হয়েছেন। ফাউলের শিকার হয়েছেন ৩ বার (ম্যাচের সর্বোচ্চ)। সাধারণত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা ফাউল করে থাকেন, কিন্তু রদ্রি এত নিখুঁত খেলেছেন যে ফরাসি ফরোয়ার্ডরাই বল কেড়ে নিতে তাকে ফাউল করতে বাধ্য হয়েছেন।

পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই তার পাসিং একুরেসি ছিল ৯৩%। বাতাসে বল দখলের লড়াইয়ে জিতেছেন ৭৯% ম্যাচ। তার এই অতিমানবীয় রক্ষণব্যূহের কারণেই ফ্রান্সের মতো ভয়ঙ্কর দলের বিরুদ্ধে স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমনকে পুরো ম্যাচে একটি শটও সেভ করতে হয়নি।

সেমিফাইনালের মতো হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে সাড়ে ১২ কিলোমিটারের বেশি দৌড়েছেন। ম্যাচ শেষে যখন সবাই ক্লান্ত, রদ্রি তখন স্বভাবসুলভ ঠান্ডা মাথায় যেন সব আলো নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দিলেন। সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘ধাপে ধাপে আমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলাম। দল রোমাঞ্চিত। এখন আমাদের শান্ত থাকতে হবে এবং বিশ্রাম নিতে হবে।’

ফুটবল বিশ্বে গোল করার জন্য অনেক সুপারহিরো আছেন, কিন্তু প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুষে নিয়ে দলকে জয়ী করার মতো সুপারহিরো বিরল। রদ্রি হলেন সেই বিরলতম বর্ম। আর মাত্র একটি ম্যাচ জিতলেই ১৬ বছর আগের সেই বনবাসে থাকা কিশোর রদ্রির অপূর্ণ স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে ৩০ বছরের এক পরিণত বিশ্বজয়ীর হাতে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন