একসময় কোচরা নোটবুক হাতে মাঠের পাশে দাঁড়াতেন, চোখের দেখায় খেলা পড়তেন। সেদিন এখন আর নেই। এখন তাদের হাতে ডেটা, অ্যালগরিদম আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। শুধু ডাগআউটে নয়, এবারের বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ছায়া পড়েছে মাঠের ভেতরে, বলের ভেতরে, এমনকি রেফারির কানের ভেতরেও। বিশ্বকাপ-২০২৬ শুধু ফুটবলে নয়, প্রযুক্তিরও এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে।
বলের ভেতরেই এআই সেন্সর
এবারের বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ‘ট্রাইওন্ডা’—স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘তিন ঢেউ’। অ্যাডিডাসের তৈরি এ বলটি শুধু চোখে দেখতেই সুন্দর নয়, এর ভেতরে আছে অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তি। একটি ক্ষুদ্র আইএমইউ (ইনার্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট) সেন্সর চিপ বলের প্রতিটি নড়াচড়া প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার রেকর্ড করছে। বলের গতি, ঘূর্ণন এবং তিনটি মাত্রায় অবস্থান—সবকিছুর তথ্য রিয়েল টাইমে পাঠাচ্ছে ভিএআর সিস্টেমে। অফসাইডের মতো জটিল সিদ্ধান্তেও এ তথ্য সরাসরি কাজে লাগবে রেফারির।
অফসাইডেও কাটছে ভুলের সুযোগ
অফসাইডের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ম্যাচ শেষে বিতর্ক—এমন দৃশ্য এবার কমতে পারে অনেকটাই। ফিফা এবার চালু করেছে উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি। আগে কোনো খেলোয়াড় ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে থাকলে সংকেত যেত। এখন মাত্র ১০ সেন্টিমিটার অফসাইডেও সিগন্যাল চলে যাবে সরাসরি রেফারির কানে ছোট্ট একটি মাইক্রো এয়ারফোনে। অপেক্ষা করতে হবে না ভিএআর কক্ষের যোগাযোগের জন্য। সিদ্ধান্ত আসবে দ্রুত, বিতর্কও কমবে।
খেলোয়াড়দের থ্রিডি অবতার
ফিফা এবং লেনোভোর অংশীদারত্বে এবার আসছে এআই-চালিত থ্রিডি প্লেয়ার অ্যাভাটার। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি খেলোয়াড়কে ডিজিটালি স্ক্যান করে তৈরি হবে সুনির্দিষ্ট থ্রিডি মডেল। মাত্র এক সেকেন্ডের স্ক্যানে ধরা পড়বে শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সঠিক মাপ। দ্রুতগতি বা ভিড়ের মধ্যে খেলোয়াড়কে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে এই মডেল কাজে আসবে। এর পাশাপাশি ১০৪টি ম্যাচেই রেফারির শরীরে থাকবে ক্যামেরা, দর্শকরা অনুভব করতে পারবেন মাঠে থাকার অনুভূতি।
ডাগআউটে এআইয়ের দাবার ছক
হাই প্রেসিং, ফলস নাইন, ইনভার্টেড ফুলব্যাক, পজিশনাল প্লে—আধুনিক ফুটবলের কৌশল এখন চলমান দাবার বোর্ডের মতো। এই জটিল সমীকরণ সমাধানেও ঢুকে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রতিপক্ষের বিশ্লেষণ, খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন, সঠিক কৌশল নির্ধারণ এবং স্কাউটিং—সব ক্ষেত্রেই কোচরা এখন এআইয়ের পরামর্শ নিচ্ছেন। পেপ গার্দিওলার দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত ইউরোপীয় ধারা এবং নতুন প্রজন্মের কোচদের উদ্ভাবনী চিন্তা—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপের ডাগআউট হতে চলেছে প্রযুক্তি ও মানব বুদ্ধির এক অদ্ভুত মিলনক্ষেত্র। তবে সব প্রযুক্তির শেষে অথবা তার পরিচালনায় যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি কিন্তু রক্ত-মাংসের মানুষ। বলের সেন্সর, রেফারির এয়ারফোন, থ্রিডি অ্যাভাটার বা এআই বিশ্লেষণ—শেষ সিদ্ধান্তটা নেয় কিন্তু একজন মানুষই। কে গোল করবেন, কোন কোচের ছক কাজ করবে, কোন দল বিশ্বসেরা হবে—সেটা কোনো অ্যালগরিদম বলে দিতে পারে না। সেই সমাধান আসবে মাঠের লড়াইয়ে থাকা খেলোয়াড়দের কাছ থেকেই। এটাই ফুটবলের অসীম আকর্ষণ। প্রযুক্তি শুধু মঞ্চ তৈরি করে দেয়, খেলাটা খেলে যায় মানুষ। ফুটবলের সৌন্দয় ওখানেই!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


