বিশ্বকাপের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে বেশ ভারী মনে হবে। রথী, মহারথী, কিংবদন্তিদের মেলবন্ধনে সে এক রোমাঞ্চের যাত্রা। কিন্তু প্রশ্নটা আসে বর্তমানের পথে চলতে গেলে। পেলে কিংবা ম্যারাডোনা নেই, রোমাঞ্চের ভারটা বয়ে নিয়ে চলছেন কারা? উত্তর আসবে এক লহমায়— লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ইতিহাসের ধারাপাতে দুজনই সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। দুজনই বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষবারের মতো হাঁটতে নামছেন। এ সময়ে এসে অতীতের সোনালি ফ্রেমে তাকালে কেবলই দেখা মেলে আবেগের মহাকাব্য। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে দাঁড়িয়ে ফুটবল বিশ্বও যেন একই প্রশ্ন করছে—এটি কি লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শেষ নৃত্য, নাকি নতুন কোনো স্বপ্নের শুরু?
সূর্যাস্তের আগে শেষ আলো
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্বকে শাসন করেছেন মেসি ও রোনালদো। একসময় মনে হতো, পৃথিবীর প্রতিটি মাঠ, প্রতিটি ট্রফি, প্রতিটি ব্যালন ডি’অর যেন তাদের দুজনের জন্যই তৈরি। কিন্তু সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। ২০২৬ বিশ্বকাপের সময় মেসির বয়স হবে ৩৯। রোনালদোর ৪১। ফুটবলের কঠিন বাস্তবতায় এই বয়সে বিশ্বকাপ খেলা নিজেই এক বিস্ময়। অথচ তারা এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ, কিংবদন্তিরা বয়সে নয়— প্রভাবেই নিজেদের সংজ্ঞায়িত করেন।
মেসি : অপূর্ণতার গল্প থেকে পূর্ণতার মহাকাব্য
লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা যেন এক দীর্ঘ উপন্যাস। ২০০৬ সালে জার্মানির মঞ্চে এক কিশোর প্রতিভা হিসেবে আবির্ভাব। ২০১০ সালে প্রত্যাশার চাপ। ২০১৪ সালে ফাইনালে পৌঁছে হৃদয়ভাঙা পরাজয়। ২০১৮ সালে হতাশা। ২০২২ সালে কাতারে অবশেষে স্বপ্নপূরণ। বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির কাছে প্রমাণ করার আর কিছুই বাকি নেই। তিনি আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে। তবু ২০২৬ বিশ্বকাপের আকর্ষণ অন্য জায়গায়। এটি হয়তো হবে সেই শিল্পীর শেষ ক্যানভাস, যিনি দুই দশক ধরে ফুটবলকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন। প্রতিটি পাস, প্রতিটি ড্রিবল, প্রতিটি গোল তখন কেবল ম্যাচের অংশ থাকবে না; হয়ে উঠবে স্মৃতির সংগ্রহ।
রোনালদো : অসমাপ্ত স্বপ্নের পেছনে ছোটা
মেসির গল্প যেখানে পূর্ণতা পেয়েছে, রোনালদোর গল্প সেখানে এখনো কিছুটা অসম্পূর্ণ। ইউরো জিতেছেন, নেশনস লিগ জিতেছেন, অসংখ্য গোলের রেকর্ড ভেঙেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি এখনো তার হাতে ওঠেনি। ২০০৬ সালে সেমিফাইনাল ছিল সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়া। এরপর বহুবার চেষ্টা করেও বিশ্বকাপের সিংহাসনে বসা হয়নি। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ রোনালদোর জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি হয়তো শেষ সুযোগ। শেষ লড়াই। শেষবারের মতো অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা। ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই ৪০ পেরিয়ে বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রোনালদো সেই বিরল তালিকায় নিজের নাম লেখাতে চলেছেন।
দুই মহারথী, এক যুগের সমাপ্তি
ফুটবলের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দ্বৈরথের নাম মেসি বনাম রোনালদো। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো বিদ্বেষের ছিল না, ছিল শ্রেষ্ঠত্বের। একজন জাদুকর, অন্যজন যোদ্ধা। একজন কবি, অন্যজন স্থপতি। একজন খেলার সৌন্দর্য, অন্যজন খেলার শক্তি। তাদের সোনালি পায়ে ফুটবলপ্রেমীরা এমন এক যুগ দেখেছে, যা হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না।
শেষ নৃত্য নাকি নতুন স্বপ্ন
হয়তো এটাই শেষবারের মতো বিশ্বকাপের আলোয় হাঁটবেন মেসি ও রোনালদো। হয়তো স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে শেষবারের মতো উঠবে তাদের নামের গর্জন। আবার এটাও হতে পারে, তারা নতুন করে প্রমাণ করবেন—স্বপ্নের কোনো বয়স নেই। যে বিশ্বকাপে ইয়ামাল, বেলিংহাম, ভিনিসিয়ুস কিংবা এমবাপ্পেরা নতুন যুগের প্রতিনিধিত্ব করবেন, সেই বিশ্বকাপেই মেসি ও রোনালদো মনে করিয়ে দেবেন কেন একটি পুরো প্রজন্ম তাদের ভালোবেসেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু নতুন নক্ষত্রের জন্মের গল্প নয়। এটি হয়তো দুই সূর্যের অস্ত যাওয়ার আগে শেষবারের মতো পৃথিবীকে আলোকিত করার গল্পও।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


