নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের গোধূলিলগ্নে যখন বিশ্বকাপ ফাইনালের বাঁশি বাজল, তখন সেটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের সমাপ্তি ছিল না; সেটি ছিল দুই মহাতারকার নিয়তি নির্ধারণের মুহূর্ত। এক পাশে ছিলেন ৩৯ বছর বয়সি ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসি, যার জন্য পুরো টুর্নামেন্টটি ছিল টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতে অমরত্বের গল্প লেখার মঞ্চ। অন্য পাশে ছিলেন রদ্রি-স্প্যানিশ মাঝমাঠের এক নিঃশব্দ সেনাপতি, যিনি এক বছর আগেও হাসপাতালের বেডে শুয়ে ক্যারিয়ার বাঁচানোর লড়াই করছিলেন।
শেষ পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের সূর্য ডুবল মেসির ট্র্যাজেডি আর রদ্রির রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে। অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তায় আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পুনরুদ্ধার করল লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন।
পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনা খেলেছে স্বপ্নের মতো। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি আট গোল এবং চার অ্যাসিস্ট করে দলকে একাই টেনে নিয়ে গেছেন ফাইনালে। বিশেষ করে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মেসির জাদুকরি দুটি অ্যাসিস্টেই ২-১ ব্যবধানের মহাকাব্যিক জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ফাইনালেও ফুটবলপ্রেমীরা মেসির হাতেই ট্রফি দেখছিলেন।
কিন্তু আর্জেন্টিনার এই ‘অদম্য শক্তি’ মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এসে ধাক্কা খেল স্পেনের এক ‘অচল বস্তুর’ সামনে। পুরো বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল খাওয়া স্প্যানিশ রক্ষণভাগকে ভাঙার কোনো চাবিকাঠি আর্জেন্টিনার জানা ছিল না। আর এই রক্ষণভাগকে যিনি ইস্পাতকঠিন নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, তিনি আর কেউ ননÑমাঝ মাঠের জেনারেল রদ্রি।
লা রোজাদের হয়ে পুরো বিশ্বকাপজুড়ে মাঝমাঠ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেছেন রদ্রি। স্পেন দলের হয়ে বিশ্বকাপ অভিযানের সময় সব মিলিয়ে ৭৫৬টি সফল পাস দেন। ১৯৬৬ সালে পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর যেকোনো একক বিশ্বকাপে এটাই সর্বোচ্চ পাসের রেকর্ড। বিশ্বজয়ের পথে স্পেনের আটটি ম্যাচের প্রতিটিতেই দাপট দেখিয়েছেন মাঠে। এর মধ্যে বল স্পর্শ (৯১০ বার), প্রতিপক্ষের অর্ধে পাস (৪২৮টি) এবং রক্ষণ চেরা ‘লাইন-ব্রেকিং’ পাস (১২২টি) দিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন। যার মধ্যে ৭৬টি পাস ছিল প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে। সব সূচকেই তিনি ছিলেন সবার উপরে।
ফাইনালে ১০০-এর বেশি সফল পাসের রেকর্ড রয়েছে (১৯৬৬ সাল থেকে) মাত্র তিন খেলোয়াড়ের। ১৯৯৪ সালের ফাইনালে ব্রাজিলের দুঙ্গা (১৩০টি) প্রথম এই কীর্তি গড়েছিলেন। এরপর এ বছরই স্পেনের রক্ষণভাগের তরুণ তুর্কি পাউ কুবার্সি (১২১টি) এবং রদ্রি (১০১টি) ফাইনালে ১০০-এর বেশি পাস সম্পন্ন করার অনন্য নজির গড়েন।
২০২৪-২৫ মৌসুমে যখন রদ্রি এসিএল ইনজুরিতে পড়েন, তখন ফুটবল বিশ্ব ধরে নিয়েছিল এই মিডফিল্ডারের সোনালি দিন শেষ। গত মৌসুমের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন পুনর্বাসনে, ম্যাচ মিস করেছেন নিয়মিত। কিন্তু স্পেনের হেড কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ধৈর্য হারাননি। জানতেন, তার দলের ইঞ্জিন রুম সচল রাখতে রদ্রির বিকল্প নেই।
ফাইনালে রদ্রি কোচের সেই আস্থার প্রতিদান দিলেন এক ফুটবলীয় মাস্টারক্লাস দিয়ে। ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা, আর্জেন্টিনার আক্রমণ মাঝপথেই কেটে দেওয়া এবং আক্রমণভাগে বলের জোগান দেওয়াÑসব একাই করলেন। পুরো ম্যাচে ৯৯ পাসের মধ্যে ৯৪টি সফল পাস দিয়ে স্পেনের মাঝমাঠকে করে তুলেছিলেন অপরাজেয়। তার এই ছায়াতলে খেলেই পাউ কুবার্সির মতো তরুণ ডিফেন্ডাররা ফাইনালে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াতে পেরেছেন। আর এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সেরই স্বীকৃতিস্বরূপ ফিফা তাকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ দিয়ে ভূষিত করে।
২০২৪ সালে যখন রদ্রি ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন, তখন পটভূমি ছিল স্পেনের ইউরো জয়। এবার প্রেক্ষাপট আরো বড়, মঞ্চটি বিশ্বকাপের। স্পেন এ বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে গড়ে মাত্র ১.৭৫ গোল করেছে, যা আক্রমণাত্মক ফুটবলপ্রেমীদের হয়তো পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কিন্তু রদ্রি প্রমাণ করেছেনÑগোল করাই শেষ কথা নয়, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাও ট্রফি জেতার সমান কার্যকর।
ইনজুরির অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চের সেরা খেলোয়াড় হওয়া এবং দেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার পর এই শরতে রদ্রির হাতে দ্বিতীয় ব্যালন ডি’অর উঠা এখন সময়ের দাবি। কোচ দে লা ফুয়েন্তে ঠিকই বলেছিলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছি সে-ই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়।’ মেটলাইফের রাত সে দাবিতেই সিলমোহর বসিয়ে দিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

