ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ‘ব্রোঞ্জ’ জেতার ম্যাচ আজ

ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ‘ব্রোঞ্জ’ জেতার ম্যাচ আজ
1000006612

পরাশক্তিদের ফুটবলমঞ্চে কেউ কখনো সান্ত্বনার পুরস্কার চায় না। ‘ব্রোঞ্জ মেডেল’ জেতার লক্ষ্য নিয়ে কেউ পা রাখে না ফিফার এ ফ্ল্যাগশিপ টুর্নামেন্টে। কিন্তু সেমিফাইনালের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় যখন শিরোপার সোনালি স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়, তখন বিদায়ের আগে অন্তত একটি জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করার এক প্রবল তাগিদ কাজ করে মনের গভীরে। আজ বিশ্বকাপের এমনই এক ‘মর্যাদার লড়াইয়ে’ মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। মিয়ামি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং রূপ নিয়েছে দুদলের আত্মসম্মান রক্ষার এক মহাকাব্যিক সমর। যদিও এই ম্যাচ কেউ খেলতে চায় না। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকায় দুদল অনেকটা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুখোমুখি হচ্ছে আজ রাত ৩টায়।

সেমিফাইনালের মঞ্চে পুরো টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট তকমা নিয়ে মাঠে নেমেছিল ফ্রান্স। কিন্তু স্পেনের তরুণ, গতিশীল ও আধুনিক ফুটবল কৌশলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি কিলিয়ান এমবাপ্পের দল। ২-০ গোলের পরিষ্কার ব্যবধানে হেরে ফাইনালের টিকিট হাতছাড়া হয়েছে ব্লুজদের। পুরো ম্যাচে স্প্যানিশ রক্ষণভাগের বিপক্ষে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ এতটাই নিষ্প্রাণ ও নিষ্ক্রিয় ছিল যে, তাদের প্রত্যাশিত গোল ছিল মাত্র ০.৩১। যা ফ্রান্সের আক্রমণভাগের শক্তির সঙ্গে চরম বেমানান। ম্যাচ শেষে দলের এই রক্ষণাত্মক রণকৌশল নিয়ে খোদ অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে ও নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, বর্তমান শিরোপাধারী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুর্দান্ত শুরু করেও শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ হয় ইংল্যান্ডের। তরুণ উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডনের চমৎকার গোলে শুরুতেই লিড নিয়েছিল থ্রি লায়ন্সরা। তবে লিড নেওয়ার পর অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশলে যাওয়ার চরম খেসারত দিতে হয় তাদের। লিওনেল মেসির জাদুকরী দুটি অ্যাসিস্টে এনজো ফার্নান্দেজ এবং লাউতারো মার্টিনেজের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ২-১ ব্যবধানে হেরে মাঠ ছাড়ে টমাস টুখেলের শিষ্যরা। এই হারের মাধ্যমে ২১ শতকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচে লিড নিয়েও ফাইনালে উঠতে না পারার একমাত্র লজ্জাজনক রেকর্ডটি এককভাবে নিজেদের করে নিল ইংল্যান্ড। ২০১৮ সালের ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের পর এবারও শেষ চারের একই দুর্ভাগ্য বরণ করতে হলো ইংলিশদের।

দলীয় অর্জনের সঙ্গে এই ম্যাচটি ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণেরও এক বড় মঞ্চ। আসরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ আটটি গোল করে গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। তবে তার ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন ইংল্যান্ডের দুই তারকা হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিংহাম—দুজনের ঝুলিতেই রয়েছে ৬টি করে গোল। আজকের ম্যাচে কেইন বা বেলিংহামের সামনে সুযোগ থাকবে এক জাদুকরী পারফরম্যান্সে এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার, যা ম্যাচটিতে ছড়াবে বাড়তি উত্তেজনা।

ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ দিদিয়ের দেশমের জন্য এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে তার দীর্ঘ, বৈচিত্র্যময় ও বর্ণিল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। ৫৭ বছর বয়সি কোচের বর্ণাঢ্য বিদায়টা ফাইনালের মঞ্চে হতে পারত, কিন্তু স্পেনের কাছে হারের পর তার অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে ফ্রান্সে তীব্র সমালোচনা চলছে। দেশম চাইবেন ১৯৮৬ সালের পর ফ্রান্সকে তাদের ইতিহাসে চতুর্থ ব্রোঞ্জ মেডেল এনে দিয়ে অন্তত একটি পোডিয়াম ফিনিশের মাধ্যমে নিজের রাজকীয় ক্যারিয়ারের ইতি টানতে।

বিপরীতে, ইংল্যান্ডের ডাগআউটে থাকা টমাস টুখেল এখন ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও ফুটবল বোদ্ধাদের সমালোচনার তীরে বিদ্ধ। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে অতিরিক্ত ভীতিগ্রস্ত রক্ষণাত্মক মানসিকতার কারণে তাকে ইতোমধ্যেই ‘জনসাধারণের এক নম্বর শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এমনকি এফএ কর্তৃক তার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও চারদিকে উঠছে নানা প্রশ্ন। তবে এই ম্যাচটি জিতে ‘ব্রোঞ্জ মেডেল’ নিশ্চিত করতে পারলে তা হবে ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। এটাই তাদের একমাত্র বিশ্ব শিরোপা। কারণ এর আগে ১৯৯০ ও ২০১৮ সালের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হেরে তাদের চতুর্থ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।

ম্যাচের আগে দুদলেই লেগেছে চোটের ধাক্কা। ফ্রান্সের রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ উইলিয়াম সালিবা পিঠের পুরোনো চোটের কারণে সেমিফাইনালের প্রথমার্ধেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন, তার এই ম্যাচে খেলা প্রায় অসম্ভব। তার জায়গায় ক্রিস্টাল প্যালেসের উদীয়মান তারকা ম্যাক্সেন্স লাক্রোয়া একাদশে আসতে পারেন। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড শিবিরেও চোটের কারণে ছিটকে গেছেন নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার রিস জেমস। তার অনুপস্থিতিতে ডিজেড স্পেন্স এবং তরুণ নিকো ও’রাইলি রক্ষণভাগ সামলানোর দায়িত্ব পাবেন। তবে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের পর রেফারি বা প্রতিপক্ষের সঙ্গে তর্কে জড়ানো জুড বেলিংহামের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা না আসায় টুখেল তার সেরা মধ্যমাঠ নিয়েই মাঠে নামতে পারবেন।

একদিকে ফরাসি কিংবদন্তি দেশম বিদায়ের সম্মান রক্ষা, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের বড় দলের বিপক্ষে নকআউটের ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙার কঠিন চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে মিয়ামির এই মহারণ সান্ত্বনার ম্যাচ হলেও উত্তেজনার পারদ থাকবে তুঙ্গে। মাঠের লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে, তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন