আর্জেন্টিনা বনাম কেপ ভার্দে

আরেকটি মেসিনামা নাকি রূপকথার নতুন অধ্যায়

Picsart_26-06-04_12-40-53-266
এম. এম. কায়সার

আরেকটি মেসিনামা নাকি রূপকথার নতুন অধ্যায়
সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলনে ব্যস্ত লিওনেল মেসি। ছবি: এএফপি

একটা দল এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে যা খেলছে, যা করেছে আর যে গল্প লিখছে তাকে বলে ফুটবলীয় রূপকথা। দলটা কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে এই নামে যেকোনো দেশ আছে সেটা সম্ভবত বেশির ভাগ মানুষ জানতে না। নিজেদের বিশ্ব মানচিত্রে চিনিয়েছে কেপ ভার্দে ফুটবল ক্যারিশমায়।

বিশ্বকাপ ফুটবলে কেপ ভার্দের সেই রূপকথার গল্পে কি নতুন কোনো অধ্যায় যোগ হচ্ছে, নাকি এটাই হতে চলেছে তাদের গল্পের শেষ পাতা? সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি আর্জেন্টিনা।

বিজ্ঞাপন

-কোন আর্জেন্টিনা? বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন যারা। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে যে দলটি। বিশ্বকাপে এসেছে তারা শিরোপা অক্ষুণ্ণ রাখার মিশন নিয়ে। সেই লক্ষ্যে আজ তাদের সামনে বাধার নাম কেপ ভার্দে।

পরিসংখ্যান, শক্তি, র‌্যাংকিং, ফর্ম, সম্ভাবনা, কৌশল—এই ম্যাচের এমন সবকিছুতেই আর্জেন্টিনার সঙ্গে কেপ ভার্দের বাস্তবিক পার্থক্য যেন আশি তলার সঙ্গে একতলার ছাদের হিসাব-নিকাষ!

এমন বিপুল পার্থক্য নিয়েই বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ৪টায় মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের রাউন্ড অব থার্টি টু-তে মুখোমুখি হচ্ছে এ দুই দেশ। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ফুটবল এই বিশ্বকাপে এখন আত্মবিশ্বাস, আগ্রাসন আর ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে, যারা অভিষেক বিশ্বকাপেই লিখে ফেলেছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সুন্দর রূপকথা।

গ্রুপ পর্বে নাটকীয় কায়দায় তিন ম্যাচে ড্র করেছে তারা। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে কোনো দল তাদের হারাতে পারেনি! গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে কেপ ভার্দে রাউন্ড অব থার্টি টুর টিকিট পেয়েছে।

কিন্তু ফুটবল বড় নিষ্ঠুর। এখানে রূপকথা টিকিয়ে রাখতে হলে সামনে থাকা পাহাড়কেও পরাস্ত করতে হয়। আজ কেপ ভার্দের সামনে সেই পাহাড়ের নাম আর্জেন্টিনা যে দলে আছেন এই গ্রহের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি।

বয়স ৩৯। কিন্তু মাঠে তাকে দেখে সেটা বিশ্বাস করার উপায় নেই। মেসি যেন সময়কে উল্টো দিকে হাঁটতে বাধ্য করেছেন। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার আট গোলের ছয়টিই এসেছে তার পা থেকে। টানা সাত বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করে তিনি এমন এক ধারাবাহিকতার জন্ম দিয়েছেন, যে রেকর্ড এখন পর্যন্ত শুধুই তার। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে চলেছেন তিনি। এটি মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, অথচ মনে হচ্ছে, এটাই যেন তার সবচেয়ে উপভোগ করা বিশ্বকাপ। মেসির পায়ে বল মানেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের শরীরী ভাষা বদলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সবাই অতিরিক্ত সতর্ক। কারণটা জানা, মেসিকে এক সেকেন্ড সময় দেওয়া মানেই বিপদকে আমন্ত্রণ। মাঠের বল তখন জালে! মেসি এখন শুধু একজন খেলোয়াড় নন। তিনি আর্জেন্টিনার পুরো আক্রমণের হৃৎস্পন্দন। আর্জেন্টিনার পেছনের চার ম্যাচে সবকটিতেই মেসির গোল। বিশ্বকাপ শুরুই করেছেন হ্যাটট্রিক দিয়ে। কোথায় থামবেন? আজ কি তাহলে আরেকটি হ্যাটট্রিক? আরেকটি মেসিময় ম্যাচ? শনিবার ভোরে টিভি সেটের সামনে বসে পড়ুন, উত্তরের খোঁজে।

মেসির সঙ্গে দলের বাকি তারকারাও জ্বলে উঠেছেন। লাউতারো মার্তিনেজ বিশ্বকাপে তার প্রথম গোল পেয়েছেন। লো সেলসে ফ্রি কিক থেকে চোখ জুড়ানো গোল করেছেন। মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নিয়ন্ত্রণ, সামনে মেসি-লাউতারোর বিধ্বংসী জুটি, আর পেছনে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর নেতৃত্বে অটল রক্ষণ, গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা যেন এক ভারসাম্যপূর্ণ যোদ্ধার দল। আর্জেন্টিনার ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো আগ্রাসন। তারা শুধু ম্যাচ জিততে চায় না, প্রতিপক্ষের ওপর নিজেদের আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই হাই প্রেস। মাঝমাঠে সংখ্যার আধিক্য তৈরি করে প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করা। তারপর দ্রুত ছোট ছোট পাসে ডিফেন্স ভেঙে মেসি কিংবা লাউতারোকে ডি-বক্সে পৌঁছে দেওয়া—এটাই স্কালোনির সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।

কেপ ভার্দের বিপক্ষেও এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসার কোনো কারণ নেই। শুরু থেকেই বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখার চেষ্টা করবে আলবিসেলেস্তেরা। দুই ফুলব্যাককে অনেক ওপরে তুলে আক্রমণের পথ চওড়া করবে, যাতে কেপ ভার্দের ঘন রক্ষণে ফাঁক বের করা যায়। আর সেই ফাঁক একবার তৈরি হলে, বাকি কাজটা মেসির বাঁ পা কিংবা লাউতারোর ফিনিশিং।

তবে কেপ ভার্দেকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এই দলটাই স্পেনকে আটকে দিয়েছে গোলশূন্য ড্র করে। উরুগুয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ শেষ করেছে ২-২ গোলের সমতায়। সৌদি ম্যাচও শেষ করেছে গোলশূন্য ড্রয়ে। তাদের রক্ষণ শৃঙ্খলাবদ্ধ, পাল্টা আক্রমণ দ্রুত, আর গোলরক্ষক ভজিনিয়া এই বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আবিষ্কার।

এই দলের পুরো পরিকল্পনা হবে একটাই-রক্ষণকে যতটা সম্ভব সংকুচিত রাখা, মাঝমাঠে জায়গা না দেওয়া এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠা। আর্জেন্টিনাকে যত বেশি সময় হতাশ রাখা যাবে, ততই ম্যাচে বাড়বে তাদের বিশ্বাস। কিন্তু সমস্যাটা হলো, প্রতিপক্ষ যদি মেসি হন, তাহলে ৯০ মিনিটে একরত্তি ভুল করলে সমূহ বিপদ নিশ্চিত!

কাগজে-কলমে এই ম্যাচের সব হিসাবই আর্জেন্টিনার পক্ষে। তবু বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো, এখানে অসম্ভবও মাঝে মাঝে সম্ভব হয়ে যায়। কেপ ভার্দে চাইবে আরেকটি অলৌকিক রাত। আর্জেন্টিনা চাইবে আরেকটি বড় জয়। দুই দলের স্বপ্নের মাত্রা দুই রকম। কেপ ভার্দে নিজেদের বিশ্বকাপ রূপকথার গল্প আরেকটু দীর্ঘ করতে চায়। আর আর্জেন্টিনার চাওয়া আগ্রাসী মেজাজে পরের রাউন্ডের টিকিট হাতে পাওয়া।

কেপ ভার্দের রূপকথার গল্প এখানেই শেষ—এই ম্যাচের স্ক্রিপ্টে সেই সংলাপই লিখতে প্রস্তুত আর্জেন্টিনা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন