জুলাই বিপ্লবে হত্যাকাণ্ড

চলতি মাসেই রায় হতে যাচ্ছে দুই মামলার

চলতি মাসেই রায় হতে যাচ্ছে দুই মামলার

জুলাই বিপ্লবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই মামলার রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে চলতি মাসেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এর মধ্যে একটি মামলায় আসামি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজন। অপর মামলায় আসামি দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ আসামি চারজন।

সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ৮ সেপ্টেম্বর হবে ঠিক করা হয়েছে। এর ঘোষণা আজ রোববারেই দেওয়া হতে পারে। এছাড়া কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডের মামলার রায় চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে সূত্র। মামলা দুটি বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছে ট্রাইব্যুনাল।

বিজ্ঞাপন

দুটি মামলারই বিচারিক কার্যক্রম চলেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির।

ওবায়দুল কাদেরের মামলার অপর আসামিরা হলেন— আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। মামলাটি গত ১৭ আগস্ট প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল।

যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশন আসামিদের যাবতীয় অপরাধের বিবরণ তুলে ধরে। প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে জানায়, জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়। এ মামলায় দাখিল করা বিভিন্ন অডিও-ভিডিওতে এসবের প্রমাণ উঠে এসেছে। এছাড়া আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। ওবাদুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাহাউদ্দিন নাছিম।

এছাড়া সভাপতি পরশ ও সাধারণ সম্পাদক নিখিলের নির্দেশে যুবলীগ সারা দেশে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। নিখিলকে সরাসরি ছাত্রজনতার ওপর হামলার নেতৃত্বের ভিডিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। কাদেরের সঙ্গে পরশের কথোপকথনের অডিও উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম ও সাধারণ সম্পাদক ইনানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়, এরপর ছাত্রলীগ সারা দেশে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।

প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালকে আরো বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে যৌথ অপরাধ সংঘটনে, একই উদ্দেশ্য নিয়ে যদি একটি গ্রুপ কোনো অপরাধ করে, তাহলে এই গ্রুপের প্রত্যেক সদস্যই সমানভাবে অপরাধী। এমনকি সরাসরি অংশ গ্রহণ না করলেও সমান অপরাধী বলে গণ্য হবে। প্রথমে ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে নির্দেশ দিলেন, মারো না কেন? এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়। এরপর ওবায়দুল কাদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেন। ফলে আমরা দেখেছি সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালানো হয়।

এছাড়া সবাইকে দিয়ে হামলা চালালে ব্যাপক হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন হবে জেনেও ওবায়দুল কাদের হামলার নির্দেশনা দিয়েছেন। এসব ঘটনায় ২৮ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে হত্যাকাণ্ডে আসামিদের সম্পৃক্ততা তুলে ধরেন। আমরা আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগের পক্ষে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করতে পেরেছি। আমরা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলদের নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানান।

এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউর আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা এই ৭ আসামির বিরুদ্ধে তাদের অপরাধের যাবতীয় প্রমাণ উপস্থাপন করেছি। আমরা মনে করি, তাদের বিরদ্ধে আনীত অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। আমরা আশা করছি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে।

চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় একই আদালত।

এদিকে জুলাই বিপ্লবে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে করা মামলায় আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গত ১০ জুন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল-২। হানিফ ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। চারজনই বর্তমানে পলাতক। এই মামলায় ১৯ জন সাক্ষী আসামিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেয়।

তবে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আসামিদের বিরুদ্ধে নতুন করে দুজন সাক্ষী উপস্থাপন করার আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে। এরপর যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে রায় হবে বলে প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে।

এই মামলায় গত বছরের ২ নভেম্বর চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। এর আগে ৫ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরদিন তা আমলে নেওয়া হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন