মান্নান সৈয়দ: কেন এবং কতটা

মান্নান সৈয়দ: কেন এবং কতটা
আবদুল মান্নান সৈয়দ

সব্যসাচী লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ ২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৬৭ বছর বয়সে পরপারের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। তিনি এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন, এটা আমাদের ভাবনার অতীত ছিল। মফস্বল শহরে বসে যতটুকু খোঁজ-খবর পেতাম তাতে জেনেছিলাম, এর আগে তিনি দু-দুবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আজীবন সৃজনশীলতার ভূতে পাওয়া মানুষের মতো শুয়ে-শুয়ে লিখে যাচ্ছিলেন নতুন ধারার প্রবন্ধ-পত্রাবলি, যেগুলো পড়ে মুগ্ধ হচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল পত্র-প্রবন্ধের নতুন জানালা তিনি ক্রমেই উন্মোচিত করছেন। সেই পথ রুদ্ধ হয়ে গেল মহান আল্লাহ তায়ালার অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে।

ষাট দশকের অনেক রথী-মহারথী মারা গেলেও আমাদের একটাই সান্ত্বনা ছিল যে, আবদুল মান্নান সৈয়দ আছেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমাদের সেই সুতা ছিঁড়ে গেল।

বিজ্ঞাপন

আমি এই মুহূর্তে তার গল্প-উপন্যাসের সাফল্যের বিচারের দিকে যাচ্ছি না। কারণ আমাদের এই জলজ আলস্যের দেশে প্রথাবিরোধী লেখামালার জন্য তাকে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, বিশেষত বাম ধারার সমালোচকদের কাছ থেকে। তবে আমার মনে হয়, তার জন্য আবদুল মান্নান সৈয়দ হয়তো প্রস্তুত ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সৃজনশীলতায় যুক্ত ছিলেন। তবে তিনি জানতেন তার লেখা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পাবে না।

প্রথম দিকে স্ব-উদ্যোগে বই প্রকাশ করেছেন, প্রকাশক পাননি। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মান্নান সৈয়দ অবশ্য জীবনের শেষ কয়েক বছর অধিকাংশ পত্র-পত্রিকার সম্পাদকের কাছে চাহিদাযোগ্য লেখকে পরিণত হয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, এখানেই তার বিজয়।

এখন স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, আবদুল মান্নান সৈয়দকে কেন আমরা স্মরণ করব? এগুলোর উত্তর আমরা বলছি কিছুটা সূত্রাকারে—

ক. আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা কবিতার ভেতরদেশে যে নতুন রীতির প্রবর্তন করেছিলেন, সেখানে তার পূর্বসূরি ছিল না, এমনকি পার্শ্বচরও ছিল না। অবশ্য অনেক সমালোচক তার কবিতায় জীবনানন্দ দাশের প্রভাব থাকার কথা বলেছেন। হয়তো কথাটা কিছুটা সত্যি। কারণ তাকে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে ব্যাপক কাজ করতে হয়েছে। তবুও এক অর্থে তিনি আমাদের বাংলা কবিতায় প্রথম পরাবাস্তব কবি।

এক লেখায় তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি যখন ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ কাব্য লেখেন তখনো জানতেন না পরাবাস্তব কী জিনিস। আসলে তার রক্তের ভেতরেই সেটা ছিল।

অবশ্য পরবর্তীকালে সচেতনভাবেই পরাবাস্তবতার ওপর লেখাপড়া করেছেন। পরাবাস্তববাদী কবিদের কবিতা অনুবাদ করেছেন, ‘পরাবাস্তব কবিতা’ নামে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে সমালোচকদের হতচকিত করে দিয়েছেন। আর এভাবে আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা কবিতার জগতে অবশ্য-উচ্চার্য কবিতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। তার কবিতা বাদ দিয়ে কোনো বাংলা কবিতা সংকলন পূর্ণতা পাবে না। তার কবিতার আলাদা কাব্যভাষা ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়ে গেছে। অবশ্য শেষের দিকে তার কবিতার গতিপ্রকৃতি তার আগের ধারা থেকে ক্রমেই সরে যাচ্ছিল, তার কবিতায় অবিরাম গদ্যচর্চার প্রভাব কার্যকর হচ্ছিল। ফলে কবিতাগুলো আগের তুলনায় রূপরসহীন হয়ে পড়ছিল। সেটা তার কবিতার নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা কি না বোঝা গেল না। তার আগেই কবি পরপারে পাড়ি দিলেন।

আবদুল মান্নান সৈয়দ তার কবিতাসমগ্রকে কালের ভেলায় ভাসাতে চেয়েছেন। অবশ্য প্রত্যেক মহৎ ও বড় কবিই সেটা কামনা করেন।

মান্নান সৈয়দ তার কবিতার বাইরে বেশি আলোচিত হয়েছেন তার গদ্যমালার জন্য। আমাদের সংকীর্ণতাযুক্ত পরিবেশে তার মতো বহুলপ্রজ ও বৈচিত্র্যময় গদ্যলেখক আর কেউ ছিলেন কি না আমাদের গবেষণা করে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে বলতে গেলে তিনি সম্রাটের মতন রাজত্ব করেছেন। তার গদ্যের বিষয়বস্তু নানা ধারায় ফোয়ারার মতন ছুটে বেরিয়েছে দিগ্‌দিগন্তে। আমার জানামতে, কেবল একজনই তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন, তিনি বুদ্ধদেব বসু। এভাবে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ সবার কাছ থেকে সমীহ আদায় করে নিয়েছেন। সেটা উপার্জিত হয়েছে তার নিজের যোগ্যতাবলে।

কোনো কবি বা লেখক তার কাছে ছোট বা নগণ্য বলে অমূল্যায়িত হননি। সামান্যতম শক্তি দেখেই তিনি সেই কবির ওপর আলোচনা করেছেন। আর সেসব কবি-সাহিত্যিককে নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন, তারাও ছিলেন ব্যক্তিজীবনে পরস্পরবিরোধী ঘরানা ও মতবাদের। যেমন, জীবনানন্দ দাশের পাশাপাশি গবেষণা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। আবার কাজী নজরুল ইসলাম হয়েছেন তার আলোচনার প্রিয় বিষয়। বাদ যাননি বিষ্ণু দে ও ফররুখ আহমদও।

বাংলাদেশে জীবনানন্দ দাশ যে নতুন করে জেগে উঠেছেন, তার নেপথ্য কুশলী বস্তুত আবদুল মান্নান সৈয়দ। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, তিনি জীবনানন্দ দাশের কবিতামালার সঙ্গে একধরনের সাযুজ্যবোধ করতেন। সেই কারণে তার কবিতামালাসহ এমনকি গল্প-উপন্যাসের রহস্য উদঘাটনেও ব্রতী হয়েছিলেন। জীবনানন্দ দাশের ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ ‘শুদ্ধতম কবি’ পড়লেই বোঝা যাবে, কবি আবদুল মান্নান বাংলাদেশের অন্য গবেষকদের মতন গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেকে ভাসিয়ে দেননি। করেছেন কঠিন পরিশ্রম, বিশ্লেষণের অপূর্ব প্রয়োগ। এই কারণে এই গ্রন্থের সমালোচনায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন—‘আবদুল মান্নান পেশায় অধ্যাপক হলেও তার আলোচনা কোনোভাবেই অধ্যাপকসুলভ নয়, এর আগে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে এভাবে কেউ আলোচনা করেনি।’

জীবনানন্দ দাশের গবেষক হিসেবে তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুই বাংলার সাহিত্যামোদীদের কাছে ছিলেন সমান গ্রহণযোগ্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘শুদ্ধতম কবি’র মুগ্ধ পাঠক হলেও তার ‘করতলে মহাদেশ’-এর প্রবন্ধগুলোর উৎকর্ষ আমাকে বেশি টানে। আমি আজও মনে করি আগামী দিনের কোনো তরুণ কবি ও প্রাবন্ধিককে প্রবন্ধ লিখতে হলে এই দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ তার অবশ্যপাঠ্য হবে। আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যিক নিরপেক্ষতা এবং বিষয়বস্তু অনুধাবনে উপলব্ধির গভীরতা তাদের অবাক করে দেবে। এখানেই আবদুল মান্নান সৈয়দের মৌলিকত্ব।

আবার লক্ষণীয়, বিষ্ণু দের মতো বিপরীত ধারার কবিও তাকে আকর্ষণ করেছে। এই কবিকে বোঝার ক্ষেত্রে তার ক্ষমতাও ছিল অপরিসীম। এ কারণে দেখা গেছে, এ বছর কলকাতায় বিষ্ণু দের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদ্বোধন করার মতো যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে তাকেই নির্বাচিত করা হয়েছে। এত বড় সম্মান এর আগে বাংলাদেশের আর কেউ পাননি।

মান্নান সৈয়দ গল্প-উপন্যাস নিয়েও অনেক আলোচনা-প্রবন্ধ লিখেছেন। তার আলোচনা প্রতিভার আরেকটি উজ্জ্বল নিদর্শন হলো ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’ প্রবন্ধ গ্রন্থটি। এখানে তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। তার বিচার প্রয়োগপদ্ধতিও অনেকখানি তুলনামূলক। আর রয়েছে অজস্র গ্রন্থ আলোচনা। আজকের তরুণ সাহিত্যকর্মীদের মলাট-আলোচনার বিপরীতে তার এসব আলোচনা সত্যিকারের সাহিত্যিক উদাহরণ। অবশ্য তার গ্রন্থ আলোচনার অনেকগুলো বেশ কয়েক বছর আগে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা’য় গ্রন্থিত হয়েছে।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, তার সহনশীলতার উদাহরণ হিসেবে এই গ্রন্থটিও তাকে অনেক দিন স্মরণীয় করে রাখবে। ব্যক্তিগতভাবে অনেক তরুণ লেখকের কাছে বইটি আমি দেখেছি।

আবদুল মান্নান সৈয়দ অনেক গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন। উপন্যাসগুলো আসলে বড় গল্প। তবে এইগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে লিখেছেন বলে আমার মনে হয় না। অনেকগুলো ইচ্ছেপূরণের উপন্যাস বলে মনে হয়। তাদের মধ্যে বেশ কিছু ঐতিহাসিক বিষয়-আশয় রয়েছে, তবে সেগুলো কবি ও কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে। আসলে কবিদের নিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ গল্প-উপন্যাস লিখতে ভালোবাসতেন। তার ‘পোড়ামাটির কাজ’ উপন্যাসটি একসময় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তবে আমার ভালো লেগেছে ‘অ-তে অজাগর’ উপন্যাসটি।

ষাট দশকে গল্প সম্বন্ধে ব্যক্তিবাদী, ভাষাচর্যাপ্রধান যে ধারা গড়ে উঠেছিল, তার ধারক-বাহকদের মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন একজন। এ নিয়ে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তার গল্পের প্রশংসা করলেও তারা কোনো গল্প আলোচনায় আবদুল মান্নান সৈয়দের নাম উল্লেখ করেননি। ভবিষ্যতে কী হবে বলতে পারি না। তবে এটুকু বলতে পারি, তার মুঠো মুঠো প্রবন্ধ আমাদের বর্তমান সাহিত্যভান্ডারে শুধু নয়, ভবিষ্যতেও আমাদের মতো মুগ্ধ পাঠকের হৃদয়ে অক্ষয় হয়ে থেকে যাবে।

আবদুল মান্নান সৈয়দকে আল্লাহ তায়ালা বেহেশতবাসী করুন—এটাই আমাদের আজকের প্রার্থনা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন