ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কটাই এখন ইনফান্তিনোর গলার কাঁটা

ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কটাই এখন ইনফান্তিনোর গলার কাঁটা

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য সময়টা ভালো যাচ্ছে না। একের পর এক সমালোচনা, কনফেডারেশনগুলোর অবস্থান বদল আর সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারের মধ্যে ফিফা-প্রধান এখন রীতিমতো একা। এমন পরিস্থিতিতে তার শেষ ভরসা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, অথচ সেই সম্পর্কই এখন তার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বের প্রায় ২০ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে ৪২০ কোটি ডলার তহবিল জোগাড়ের পরিকল্পনা এঁটেছিলেন ইনফান্তিনো। ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামের প্রস্তাবিত এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটালেরও। কিন্তু ফুটবল বিশ্বের তীব্র বিরোধিতার মুখে দিন কয়েকের মধ্যেই সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন তিনি।

বিজ্ঞাপন

পরিকল্পনা বাতিল হলেও চাপ কমেনি, উল্টো প্রতিদিনই তা বাড়ছে। নিউ ইয়র্ক পোস্টের বরাত দিয়ে জানা গেছে, পরিকল্পনা বাতিলের পর ইনফান্তিনো বারবার ফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। গণমাধ্যমের ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারে ফিফা সভাপতি নিজেকে রীতিমতো বিচ্ছিন্ন মনে করছেন বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে একান্ত বৈঠকের চেষ্টাও করেছিলেন তিনি, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা পরে জানিয়ে দেন, রুবিওর সঙ্গে এমন কোনো আলোচনার পরিকল্পনাই ছিল না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দহরম-মহরমের সম্পর্কটা বেশ পুরোনো। দুজনের প্রথম মোলাকাত হয়েছিল ২০১৮ সালের আগস্টে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আয়োজকের নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর সেই সময় হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে প্রথম দেখা হয় দুজনের। সেদিন ট্রাম্পকে নিজের নামাঙ্কিত জার্সি উপহার দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। এরপর থেকে সম্পর্কটা ক্রমশই গাঢ় হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া ‘ফিফা পিস প্রাইজ’-এর প্রথম বিজয়ী করা হয় ট্রাম্পকেই, ইনফান্তিনো নিজে হাতে তুলে দেন সেই পুরস্কার। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিসের’ প্রথম বৈঠকে ইনফান্তিনোকে দেখা যায় ট্রাম্পের দুই মেয়াদের প্রতীক ‘৪৫-৪৭’ লেখা লাল টুপি পরে।

গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপের নিউ ইয়র্ক কার্যালয়ও ট্রাম্প টাওয়ারে বসাতে জোর দিয়েছিলেন ফিফা প্রধান। এমনকি বিশ্বকাপের সময় যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের বিরুদ্ধে দেওয়া লাল কার্ড নিয়েও আলোচনা কম হয়নি। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে বালোগুনকে লাল কার্ড দেখানো হলে তা মানতে পারেননি ট্রাম্প। পরে তিনি নিজেই দাবি করেন, ফোন করে ‘বন্ধু জনিকে’ বিষয়টি সামলাতে বলেছিলেন তিনি। মূলত সেই হস্তক্ষেপেই বালোগুন এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা থেকে রেহাই পেয়ে যান। এ ঘটনা বিশ্বজুড়ে তুমুল সমালোচনার জন্ম দেয় এবং ফুটবল পরিবারের ঐক্যে বড় ফাটল ধরায়।

ফিফার ‘প্রেডিকশন মার্কেট’ অংশীদার হিসেবে গত এপ্রিলে ঘোষিত এডিআই প্রেডিক্টস্ট্রিট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও ট্রাম্প পরিবারের যোগসূত্র মিলেছে। নরওয়ের অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম জোসিমার জানিয়েছে, এই প্ল্যাটফর্মের সব লেনদেন হতো ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল নামের একটি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে, যে প্রতিষ্ঠানের বড় অংশীদার ছিল ট্রাম্প পরিবার। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টোকেন বিক্রির নিট আয়ের ৭৫ শতাংশ পেত তারা। মার্কিন কংগ্রেসম্যান জেমি র‍্যাসকিন এই ঘনিষ্ঠতাকে ট্রাম্পের অনুগ্রহ পাওয়ার বেপরোয়া প্রচেষ্টা আখ্যা দিয়ে ইনফান্তিনোকে ওয়াশিংটনে হাজির হয়ে জবাবদিহি করতে চিঠিও পাঠিয়েছেন।

পুরোনো বিতর্কের ছায়া

ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্যের বাইরে ইনফান্তিনোর অতীতেও কম বিতর্ক নেই। ২০১৫ সালে যখন ‘ফিফাগেট’ দুর্নীতি মামলা সামনে আসে, তখন উয়েফার মহাসচিব ছিলেন ইনফান্তিনো। মামলায় দণ্ডিত আর্জেন্টাইন মার্কেটিং এজেন্ট হুগো ও মারিয়ানো জিনকিসের সঙ্গে তার নাম জড়িয়েছিল উয়েফার সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির একটি চুক্তির সূত্র ধরে, যদিও যেকোনো অন্যায়ের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন তিনি। জার্মান সংবাদমাধ্যম জুড ডয়চে সাইটুংয়ের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২০১৫ সালের ৬ অক্টোবর জেনেভা থেকে নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন ইনফান্তিনো, যদিও যে বৈঠকের কথা বলে সে সফর, সেটি আসলে হয়েছিল ভিডিও কনফারেন্সেই। নিউ ইয়র্কে তিনি ঠিক কী করেছিলেন, তার ব্যাখ্যা আজও মেলেনি।

সেই সময় ব্লাটারের পদত্যাগের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং তৎকালীন মার্কিন ফুটবল ফেডারেশন প্রধান সুনীল গুলাটির সক্রিয় সহায়তাও পেয়েছিলেন ইনফান্তিনো বলে জানা যায়।

এখন কী করবেন ইনফান্তিনো?

এই মুহূর্তে ইনফান্তিনোর সামনের পথ মোটেও মসৃণ নয়। পদত্যাগের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও, তার চরিত্র বিবেচনায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বকাপ বিক্রির পরিকল্পনা ঘোষণার পর গড়ে ওঠা বিদ্রোহী শিবির চাইলে ফিফার জরুরি কংগ্রেস ডেকে অনাস্থা ভোট আয়োজন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইনফান্তিনো হেরে গেলে অন্তর্বর্তী দায়িত্ব পাবেন ফিফা কাউন্সিলের দীর্ঘতম মেয়াদের সদস্য, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান।

তবে সময় হাতে খুব বেশি নেই। ২০২৭ সালের ১৮ মার্চ নির্ধারিত ফিফা সভাপতি নির্বাচনের আগেই এমন কংগ্রেস আয়োজন করতে হলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ দাবি ওঠার পর কংগ্রেস ডাকতে ফিফার হাতে সময় থাকে তিন মাস, আর সদস্য দেশগুলোকে অন্তত দুই মাস আগে তারিখ ও ভেন্যু জানাতে হয়।

আপাতত নির্বাচনে একমাত্র ঘোষিত প্রার্থী ইনফান্তিনোই। বিশ্বকাপ শুরুর আগে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা কনফেডারেশনের সমর্থন পেয়েছিলেন তিনি, যা মোট ২১১ ভোটের মধ্যে ১১০ ভোটের জোট গড়ে তুলেছিল—তৃতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু জুনে যা সত্যি ছিল, আগস্টে এসে তা আর নেই। এশিয়ান কনফেডারেশন এখন অবস্থান বদলে উয়েফা ও কনকাকাফের বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছে। লেবানন ও কাতারের মতো হাতে গোনা কিছু এশিয়ান সদস্য এখনো তার পাশে থাকলেও, মেক্সিকো নিজেদের কনফেডারেশনের তুলনায় অনেকটাই নরম সুরে কথা বলছে। ওশেনিয়া কনফেডারেশনের ১১টি দেশও উয়েফা-কনকাকাফ-এএফসি জোটে যোগ দেওয়ার পথে বলে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে ইনফান্তিনোর হাতে এখন কেবল আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার সমর্থন, যা এককভাবে জয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। বিদ্রোহী শিবির যদি অ-ইউরোপীয় কোনো প্রার্থীকে সামনে আনে, সেক্ষেত্রে পিএসজি সভাপতি ও ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবস প্রধান নাসের আল খেলাইফির নাম আলোচনায় থাকলেও ফ্রান্সে চলমান একাধিক ফৌজদারি তদন্ত তার প্রার্থিতাকে জটিল করে তুলতে পারে। এছাড়া কনকাকাফ সভাপতি, কানাডার ভিক্টর মন্টালিয়ানির নামও শোনা যাচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে।

ট্রাম্পের কাছাকাছি থেকে যতটা ফায়দা তোলা যায়, তার সবটাই তুলতে চেয়েছিলেন ইনফান্তিনো। কিন্তু ইতিহাস বলছে, ট্রাম্পের খুব কাছে যাওয়া মানুষদের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদই ঘটেছে বেশি।

ইনফান্তিনো সে তালিকায় অবশ্য প্রথম নাম নন!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন