জুলাই বিপ্লব: রক্তাক্ত রাজপথের ঢেউ হাসপাতালে

জুলাই বিপ্লব: রক্তাক্ত রাজপথের ঢেউ হাসপাতালে
ছবি: সংগৃহীত

চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজপথের রক্তাক্ত ঢেউ গিয়ে লেগেছিল দেশের হাসপাতালগুলোতেও। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলা এবং পুলিশের গুলিতে আহতদের আর্তনাদ আর জীবন বাঁচানোর আকুতিতে বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগ পরিণত হয়েছিল একেকটি রণক্ষেত্রে।

প্রত্যক্ষদর্শী, জুলাইযোদ্ধা ও চিকিৎসকদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। একদিকে গুলিবিদ্ধ তরুণদের বাঁচাতে চিকিৎসকদের মরিয়া চেষ্টা, অন্যদিকে লাশের সারি, স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর অসহায় মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা।

বিজ্ঞাপন

তাদের বর্ণনায়, একের পর এক গুলিবিদ্ধ, রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত মানুষ এবং নিহতদের লাশ হাসপাতালে নিয়ে আসছিলেন আন্দোলনের সহযোদ্ধা ও স্বজনরা। জরুরি বিভাগ, বারান্দা ও কক্ষজুড়ে কেবলই আহতদের যন্ত্রণাকাতর আহাজারি। এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে অনেক সময় যেতে হয়েছে লাশ ডিঙিয়ে। প্রিয়জনের খোঁজে অনেক স্বজন ছুটে বেরিয়েছেন এক হাসপাতালের মর্গ থেকে আরেকটিতে।

হাসপাতালজুড়ে আহতদের স্বজন, সহপাঠী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যে চিকিৎসক ও নার্সদের কাছে একটাই আকুতি ছিল—যেভাবেই হোক জীবন বাঁচাতে হবে। কিন্তু চিকিৎসা নিতে এসেও অনেক আহত ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারদের হয়রানি ও হামলার শিকার হন। এমনকি হাসপাতালে ঢুকে হামলা চালানোর মতো ঘটনাও ঘটায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ।

সম্মুখসারির চিকিৎসক ও জুলাইযোদ্ধাদের দাবি, আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ নির্বিচারে ছররা গুলি ব্যবহার করেছিল। ফলে চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন। কেউ এক বা দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান, কেউ চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেন। গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নেননি, আবার কেউ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই ফিরে যান। ফলে আহতের প্রকৃত সংখ্যা আজও নির্ধারিত হয়নি।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, জুলাই-আগস্টের সেই সংকটময় সময়ে স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের সেবা দিয়েছেন। তবে কোথাও জরুরি বিভাগের গেট বন্ধ ছিল, কোথাও ভয়ের কারণে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে একজন বলেন, পঙ্গু হাসপাতালে আহতদের বিষয়ে ‘নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ’ নির্দেশ দিয়েছিলেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা।

জুলাই বিপ্লবের অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ঢামেক হাসপাতালের তৎকালীন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. আবরার হামিম আমার দেশকে বলেন, ‘১৯ জুলাই রাতে ইমার্জেন্সিতে গিয়ে দেখি ভয়াবহ দৃশ্য। যা আজও ভুলতে পারিনি। হাসপাতালজুড়ে ছিল রক্তের দাগ, একের পর এক গুলিবিদ্ধ মানুষ ও লাশ আসছিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে লাশ ডিঙিয়ে যেতে হয়েছে। আতঙ্কের মধ্যেও গোপনে সেটা ভিডিও করি। চারদিকে গণমাধ্যমের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। কেবল একজন সাংবাদিককে লুকিয়ে ছবি তুলতে দেখেছি।’

তিনি বলেন, সেদিন রাতভর অপারেশন থিয়েটারে অস্ত্রোপচার চলে। এ সময় শত শত ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন পড়ে। যদিও পরে তা ব্যবস্থা হয়। চিকিৎসক, ইন্টার্ন ও নার্সদের নিরলস প্রচেষ্টায় বহু আহত মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছিল।

তার দাবি, আন্দোলনকারীদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ ছিলেন। একই সঙ্গে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ছাত্র-জনতার ওপর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও তাদের সহযোগীদের হামলার ঘটনাও ঘটে। হামলার শিকার হন চিকিৎসকেরাও।

ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউর ডা. আল কায়েস সরকার আমার দেশকে বলেন, ১৮ জুলাইয়ের পর থেকে জরুরি বিভাগ, ক্যাজুয়ালটি, সার্জারি ও নিউরোসার্জারিসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোস্টারের মাধ্যমে টানা কয়েকদিন চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। বেশিরভাগ আহতের সঙ্গে কোনো স্বজন ছিল না।

তিনি বলেন, আমার কয়েকটি ঘটনার কথা খুব মনে পড়ে। মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বাজার করতে বেরিয়েছিলেন। গুলি এসে তার গলার সামনে দিয়ে ঢুকে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। ট্র্যাকিয়া ছিদ্র হয়ে যায়। দ্রুত ইনটিউবেশন করে ওটিতে নেওয়া হয়েছিল। পরে জানতে পেরেছিলাম, আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এক মাদরাসা শিক্ষককে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে আনা হয়েছিল। কাপড় সরাতেই ক্যারোটিড ধমনী থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করল। অনেক রোগীকে দেখেছি, যাদের মাথায় আঘাতে মস্তিষ্কের অংশ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। একজন এসেছিলেন বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে। বুকের ক্ষত দিয়ে ফুসফুস বেলুনের মতো ফুলে-চুপসে যাচ্ছিল। তার অসহনীয় যন্ত্রণা আজও চোখে ভাসে।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের আগে আহতদের অনেককেই পুলিশ পাহারায় রাখা হতো। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাদের আঙুলের ছাপ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহ করা হতো, সুস্থ হলে গ্রেপ্তারের আশঙ্কাও ছিল। তাই অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা স্বজনদের রোগীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি জানান, হাসপাতালের চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষার্থী, ইন্টার্ন ও স্বেচ্ছাসেবকেরা একসঙ্গে কাজ করায় অনেক মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছিল।

ঢামেকের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা নেন রিকশাচালক নুরুল ইসলাম। তিনি সেই দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা করে বলেন, ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে বিস্ফোরণের আঘাতে আমার বাঁ হাতের কয়েকটি আঙুল উড়ে যায়। পরে ঢামেকে ভর্তি হই। তখন একের পর এক রক্তাক্ত লাশ আসতে থাকে। সেই কথা ভাবলে এখনো গা শিউরে ওঠে। শরীরের বিভিন্ন স্থানের ক্ষত নিয়ে এখনো কষ্টে দিন কাটছে আমার।

ওই সময়ে ঢামেকের জরুরি বিভাগে আসা আহতদের সার্জারি, অর্থোপেডিক ও নিউরোসার্জারি বিভাগের ১০১, ১০২ ও ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হতো। সেই সময় দায়িত্বে থাকা এক নার্স আমার দেশকে জানান, এসব ওয়ার্ডে জায়গা না থাকায় অনেক রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠাতে হয়েছিল। আহতের চাপ এত বেশি ছিল যে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। রোগীদের চিৎকার-আর্তনাদে পুরো ওয়ার্ড ভারী হয়ে উঠেছিল।

তিনি বলেন, ৩ আগস্ট হাসপাতালের স্থায়ী ও অস্থায়ী মর্গ লাশে ভরে যায়। জায়গা না থাকায় কিছু লাশ বাইরে রাখতে হয়েছিল। সরকারি হিসাবে ঢামেকে ১৮৬ জন নিহতের তথ্য থাকলেও চিকিৎসকদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা ৩০০-এর বেশি।

আন্দোলনের সময় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ছিলেন ডা. সুমাইয়া আক্তার। জীবনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ২৬ জুলাইয়ে জরুরি বিভাগে পা রাখারও জায়গা ছিল না। অধিকাংশ রোগীই ছিলেন গুলিবিদ্ধ; ছররা গুলির চেয়ে গানশট ইনজুরিই ছিল বেশি। আহতদের শরীর থেকে বিভিন্ন ধরনের বুলেট বের করতে হয়েছে। ২৭ জুলাইও একই পরিস্থিতি ছিল। সীমিত জনবল ও সামর্থ্য নিয়ে মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসা দিতে চিকিৎসকদের প্রাণপণ লড়াই করতে হয়েছে।

ডা. সুমাইয়া বলেন, ৪ আগস্টের অভিজ্ঞতা ছিল আরো মর্মান্তিক। হাসপাতালে এক স্কুলছাত্রকে আনা হয়, যার মাথায় গুলি লেগে খুলির অংশ উড়ে গিয়ে মস্তিষ্ক বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু তখনো সে জীবিত ছিল। রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে তাকে প্রয়োজনীয় সময়ও দিতে পারেননি বলে জানান তিনি।

তার ভাষায়, হাসপাতালে লাশের স্তূপ দেখার চেয়েও বেশি কষ্ট হয়েছিল সেগুলো পরিবারের হাতে তুলে দিতে গিয়ে। সেই রাতের দৃশ্য আজও তার স্মৃতিতে অমলিন।

বনশ্রীর ফরাজী হাসপাতাল সূত্র জানায়, আন্দোলনের পুরো সময়ে সেখানে এক হাজারের বেশি আহত ব্যক্তির চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে রাবার বুলেট, ছররা গুলি ও সরাসরি গুলিবিদ্ধ রোগী ছাড়াও অন্যান্য আঘাতে আহত ব্যক্তিরাও ছিলেন।

উত্তরা ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারের পরিচালক (প্রশাসন) মো. নাজমুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আন্দোলনের সময় অন্তত ৫০০ আহতের চিকিৎসা দিয়েছি আমরা, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন শিক্ষার্থী। সময়টা খুব কঠিন ছিল। অনেকেই ভয়ে চিকিৎসা দিচ্ছিল না। কিন্তু আমরা সেই ভয়ের পরিবেশ সত্ত্বেও কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি।

জুলাই বিপ্লবের সময় অনাবিল হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রেজিস্টার খাতা ও সিসিটিভি সার্ভার পুলিশ নিয়ে যায় বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যে জানান হাসপাতালটির তৎকালীন ব্যবস্থাপক আবু মুসা আহমেদ। যাত্রাবাড়ীর কাজলায় কলেজছাত্র ইমাম হাসান তাইম হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।

সেই ভয়ংকর স্মৃতিচারণ করে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার বাসিন্দা শাহীন আমার দেশকে বলেন, ৫ আগস্ট সকালে উত্তরায় পুলিশের অতর্কিত গুলি আমার বাম পায়ে এসে লাগে। আমি মাটিতে পড়ে যাই। একপর্যায়ে বন্ধুরা উত্তরায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু তারা চিকিৎসা না দিয়েই ফিরিয়ে দেয়। পরে অন্য আরেকটি ক্লিনিকে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। কিন্তু তারা ভর্তি করবে না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়। তখনো পা থেকে রক্ত পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, আজকেই জীবনের শেষদিন। পরে সন্ধ্যার পর পঙ্গুতে ভর্তি হই। অথচ প্রথমদিকেই ওই দুটো হাসপাতাল যদি আমার চিকিৎসা করত, তাহলে আমাকে পঙ্গুত্ববরণ করতে না।

তিনি জানান, পায়ে ১০ বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। কিন্তু কোনো উন্নতি হয়নি। রাতে ঘুমাতে পারি না। ব্যথা-যন্ত্রণায় সারাক্ষণ ছটফট করি। আমার ভবিষ্যৎ শেষ করে দিয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশ।

জুলাই বিপ্লবের ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ডা. যাকিয়া সুলতানাকে। তিনি আমার দেশকে জানান, আন্দোলনের সময় জরুরি বিভাগে প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজন করে আহত মানুষ আসছিলেন। একসঙ্গে ১০টি অপারেশন থিয়েটার চালু রেখে চিকিৎসকেরা শত শত গুলিবিদ্ধ মানুষের চোখ বাঁচানোর লড়াই করেছেন, তবে সবার দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

ডা. যাকিয়া জানান, ১৮-২১ জুলাই এবং ৩-৬ আগস্ট ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। অস্ত্রোপচারে রাবার বুলেট নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধাতব পেলেট এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে সরাসরি বুলেট পাওয়া গেছে। চারদিন টানা অস্ত্রোপচার আর রক্তাক্ত করিডোরের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি তিনি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জুলাই বিপ্লবের সময় ও পরে চক্ষু হাসপাতলে ৮৬৪ জন আহত ভর্তি হন। এছাড়া ভর্তি ছাড়াই চিকিৎসা নেন আরো প্রায় এক হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে ৬৫০ জনের অস্ত্রোপচার করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন