লিওনেল মেসি বার্সেলোনা একাডেমিতে দাঁড়িয়ে আছেন। জীবনে প্রথমবার কাতালুনিয়ায় পা রাখা তার। পেছনের স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে ছবির মতো সুন্দর বার্সেলোনা শহর। সময়টা ২০০০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। মাত্র ১৩ বছর বয়সে এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে বাবা হোর্হে মেসির সঙ্গে বার্সেলোনায় এসেছিলেন কিশোর মেসি। ছবিটি তুলে দিয়েছিলেন হোর্হে নিজেই। এরপর কেটে গেছে দুই যুগেরও বেশি। লা মাসিয়ার সবুজ ঘাস পেরিয়ে বার্সেলোনা মাতিয়ে মেসি পৌঁছে গেছেন অমরত্বের রথে। সঙ্গে আরেকজন। হ্যাঁ, হোর্হে মেসি। ছেলের অমরত্বের পথে পুরোটা সময় বটগাছের মতো ছায়া হয়ে ছিলেন এই ভদ্রলোক। গত ৮ আগস্ট ৬৮ বছর দীপ্ত হয়ে থাকা সেই ছায়া মিশে গেছে অনন্তলোকের পথে। ইহলোকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন হোর্হে। পেছনে রেখে গেছেন পিতা-পুত্র জুটির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়।
রোজারিওর এক সাধারণ পরিবারের কর্তা থেকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের নেপথ্যের মানুষ হোর্হের জীবনটা কোনো আলাদা গল্প নয়। তার গল্পের প্রতিটি অধ্যায়ে জড়িয়ে আছেন মেসি। গল্পটা শুরু হয়েছিল রোজারিওতে। ছোট্ট মেসি মাত্র চার বছর বয়সে স্থানীয় গ্রান্দোলি ক্লাবে ফুটবল খেলতে শুরু করেন। মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে অন্যরা ছোট্ট এক ছেলেকে দেখলেও হোর্হে দেখেছিলেন তারচেয়েও বেশি কিছু। তিনি বুঝেছিলেন, ছেলের পায়ের সঙ্গে বলের সম্পর্কটা অন্যরকম। তারপর নিউ ওয়েলস ওল্ড বয়েজ। সেখানেই নজরে আসতে শুরু করে মেসির নাম। এক সময় সামনে এসে দাঁড়াল কঠিন বাস্তবতা। বয়সের সঙ্গে বাড়ছেন না মেসি!
মেসির শরীরে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসা, আর সেই চিকিৎসার খরচ ছিল পরিবারের জন্য বড় বোঝা। ইস্পাত কারখানায় কাজ করা হোর্হের সামনে তখন দুটি পথ : একদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অন্যদিকে ছেলের ভবিষ্যৎ। হোর্হে দ্বিতীয়টিকে বেছে নিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, ছেলের প্রতিভাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চিকিৎসা ও ফুটবল দুটিই চালিয়ে নিতে হবে। সেই খোঁজই একদিন তাকে নিয়ে গেল স্পেনে।
এর পরের ইতিহাস তো সবার জানা। একটি ছোট্ট ছেলে। একজন উদ্বিগ্ন বাবা। আর সামনে ইউরোপের অন্যতম বড় ফুটবল ক্লাব। এরপর একটি ন্যাপকিন এবং বার্সেলোনার তৎকালীন ক্রীড়া পরিচালক কার্লোস রেক্সাচের চুক্তির প্রতিশ্রুতি। যে মুহূর্তটি পরে ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি হয়ে যায়। সেই ন্যাপকিনের পেছনে দাঁড়িয়ে হোর্হে দেখেছিলেন অমরত্বের রথে উঠে বসা মেসিকে!
সময়ের সঙ্গে মেসির বাবা থেকে এজেন্ট হয়ে উঠেন হোর্হে। একইসঙ্গে পরামর্শদাতা ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের একমাত্র আস্থা। মেসির ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি, ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন হোর্হে। এমনকি ২০২০ সালে বার্সেলোনা ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার সময়ও মেসির পক্ষে ক্লাবের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন তিনিই। ছেলের জন্য যে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, সেটিই ছিল তার সিদ্ধান্ত। পৃথিবী মেসিকে দেখেছে, হোর্হে দেখেছেন লিওকে। এখানেই হয়তো হোর্হে-মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয়। বিশ্ব তাকে চিনেছে ‘মেসির বাবা’ হিসেবে।
হোর্হে মেসির সাফল্য নিয়ে গর্বিত থাকলেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন ছেলের মানবিক দিকটিকে। মেসির ভালো মানুষ হওয়াটা তার সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা। ফুটবল মেসিকে খ্যাতি দিয়েছে, ট্রফি দিয়েছে, অর্থ আর পৃথিবীর ভালোবাসা দিয়েছে। কিন্তু মানুষ মেসিকে ভালোবেসেছে শুধু তার গোলের জন্য নয়। তার বিনয়, পরিবার, নীরবতা এবং আচরণের জন্যও। আর সে মানুষটিকে গড়ে ওঠার পথে হোর্হের ছাপ ছিল গভীর।
বিশ্বকাপের রাতে বাবাকে খুঁজেছিলেন মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপেও হোর্হে ছিলেন মেসির ভাবনায়। অসুস্থ বাবাকে নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই বিশ্বকাপে খেলেছেন মেসি। হ্যাটট্রিকের আনন্দ মিশে গিয়েছিল চোখের জলের উষ্ণতায়। এবার সব বন্দি হলো স্মৃতির পাতায়। হোর্হে চলে গেলেন। রয়ে গেল রোজারিওর সেই ছোট্ট মাঠ। ১৩ বছরের ছেলেটিকে নিয়ে বার্সেলোনার উদ্দেশে পাড়ি দেওয়া সেই যাত্রা। ন্যাপকিনে লেখা সেই প্রতিশ্রুতি। চিকিৎসার জন্য ছুটে চলা এক বাবার উদ্বেগ। অসংখ্য চুক্তির টেবিলে বসা একজন এজেন্ট। বিশ্বকাপ জয়ের পর ছেলের মুখে ফুটে ওঠা আনন্দের পেছনের এক অদৃশ্য মুখ। আর রয়ে গেল একজন বাবার সবচেয়ে বড় অর্জন; যিনি পৃথিবীকে একজন ‘মেসি’ দিয়েছেন, নিজের কাছে রেখে গেছেন ‘লিও’কে। রোজারিওর শান্ত বিকালে মিশে গেল বিউগলের করুণ সুরে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

