যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত আরও তীব্র করার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার চালানোর পর দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই আরও তীব্র করতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইরানের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর দেশটির নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় দেশটির নেতারা আক্রমণাত্মক পন্থা অবলম্বন করছেন। মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরানের প্রধান আয়ের উৎস তেল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ইরান সংঘাত বাড়ানোর পথকেই বেছে নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, একটি মার্কিন নৌযানে হামলার চেষ্টার জবাবে তারা পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে। এর পাল্টা জবাবে ইরান জর্ডানে মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করে এমন একটি ঘাঁটিতে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। এর মাত্র তিন দিন আগে ইরান প্রথমবারের মতো একটি মার্কিন সামরিক জাহাজে হামলার চেষ্টা চালায়।

রোববার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আইনপ্রণেতাদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ‘সমানুপাতিক প্রতিক্রিয়ার’ যুগ শেষ হয়েছে। একই সময়ে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান, যা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের বাইরেও সংঘাতের পরিধি বাড়াতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা তীব্র সামরিক অভিযান ইরান অনেকাংশেই প্রতিহত করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোর এই ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ একটি অর্থনৈতিক হুমকি তৈরি করেছে, যা এখন সরকারকে তার বাগাড়ম্বর ও আক্রমণকে আরো তীব্র করতে বাধ্য করছে।
মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর মধ্যেই মঙ্গলবার দেশটির সরকার জ্বালানির সংকটের কারণে পেট্রোলের দাম বাড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়নে আগে থেকেই চাপে থাকা দেশটিতে এ সিদ্ধান্ত নতুন করে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় সীমিতসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারছে। এতে ইরানের প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও ওয়াশিংটনের ওপর ইরানের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা কিছুটা কমে যাচ্ছে।
জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের ইরান-বিষয়ক বিশ্লেষক ফারজান সাবেতের মতে, ইরান সম্ভবত সামরিক সংঘাত আরো তীব্র করার চেষ্টা করবে, তবে তারা সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরে যাওয়া এড়াতে চাইবে। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর অবস্থান, কিন্তু একই সাথে তারা আশা করছে যে এর ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বাড়বে অথবা হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘হয় সাফল্য না হয় ব্যর্থতা’
ইরানের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা যুদ্ধ বন্ধে এপ্রিলের সমঝোতা স্মারকে ফিরে গিয়ে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনায় আগ্রহী নন এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কৌশলেই এগোচ্ছেন।
ইরানের নেতৃত্ব মনে করছে, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে সংঘাত বাড়ানোর কৌশলগত সুযোগ তৈরি হয়েছে। জনপ্রিয়তা হারানো কোনো যুদ্ধ ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।
আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম আমওয়াজ.মিডিয়া-এর সম্পাদক ও ইরান বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলী শাবানি বলেন, সবকিছুই একটি সংকটময় মুহূর্তের দিকে ইঙ্গিত করছে। তিনি বলেন, কূটনীতি ব্যর্থ হলে আক্রমণের শিকার হওয়ার জন্য ইরানিরা নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কিনা, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান-বিষয়ক বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলার উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য মাত্রার উত্তেজনা বৃদ্ধি। এর আগে মার্কিন নৌযানকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে ইরান অনেক বেশি সতর্ক ছিল। এখন সেই হিসাব বদলে গেছে বলে মনে করছেন তিনি।
তার মতে, পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা এবং একটি ট্যাংকার ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা ওয়াশিংটনও এই সংঘাতকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, তার ইঙ্গিত দেয়।
মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন হিসাব
আজিজির মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। জুলাইয়ে জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনাও এর উদাহরণ। ভবিষ্যতে মার্কিন নৌবহরকেও ইরান একইভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে, মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানায়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নৌবাহিনী একটি মার্কিন ‘ডাইভ-এলডি’ সাবমেরিন ড্রোন জব্দ করেছে। ইরান অতীতে তার মিত্রদের দেওয়া বা শত্রুদের কাছ থেকে দখল করা অস্ত্রের রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, এটি পুরোনো মডেলের একটি ড্রোন, যা ত্রুটির কারণে অচল হয়ে পড়েছিল এবং এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য, শ্রেণিবদ্ধ সোনার বা রাডার সরঞ্জাম ছিল না।
পারস্য উপসাগরে নতুন ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ তৈরির ঘোষণাকেও উত্তেজনা বাড়ানোর আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা প্রধান রেজায়ি পরিকল্পনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি, কিন্তু তেহরান-ভিত্তিক পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ঘাদেরি বলেছেন, এর উদ্দেশ্য হলো মার্কিন নৌবাহিনীর প্রহরায় প্রণালীটি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর খরচ বাড়ানো এবং তাদের সতর্ক করা যে, একবার যাতায়াত শুরু করলেও তারা নিরাপদ নাও থাকতে পারে।
‘ইরানের নতুন নিয়মকানুন মেনে চলা নিরাপদ ও পরিণতিহীন যাত্রার একটি শর্ত হতে পারে’ তিনি বলেন।

অভ্যন্তরীণ সংকটও ভাবাচ্ছে তেহরানকে
ইরানের নেতাদের কাছে, যাকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছে, তা একটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে, যা তাদেরকে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে প্ররোচিত করেছে। অর্থনৈতিক দুর্দশা বাড়তে থাকলে নতুন করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
গত ডিসেম্বরে মুদ্রা সংকটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল, যা নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে দমন করে। ইরানের নেতৃত্ব আশঙ্কা করছে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ইসরাইল বিরোধীদের আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে।

ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাদি বোরহানি বলেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেও তেহরানের এই উদ্বেগের কারণ স্পষ্ট। নেতানিয়াহু চলতি সপ্তাহে ইরানি সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি এবং ওই সরকারের পতন ঘনিয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন।
কিছু ইরানি নেতা মনে করেন, এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময়, কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প এমনিতেও যুদ্ধে ফিরবেন। বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক বলেছেন, প্রেসিডেন্ট হয় একটি অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী বিজয়ে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে চাইবেন, অথবা ভাববেন যে নিজের কৌশল অনুসরণে তার আর হারানোর কিছু নেই।
এ কারণে ইরানের নেতৃত্ব মনে করছে, ইসরাইলের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই পরিস্থিতির গতিপথ বদলে দিতে পারে এমন আরো আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তবে বিশ্লেষক ফারজান সাবেত মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি সংকট আরও গভীর হলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রও উত্তেজনা কমানোর পথে যেতে বাধ্য হতে পারে। তার মতে, হরমুজ দিয়ে সীমিত পরিমাণে তেল পরিবহন সম্ভব হলেও বৈশ্বিক মজুত দ্রুত পূরণ হচ্ছে না। প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পণ্যও পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে পৌঁছাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পূর্ণাঙ্গ সমঝোতার বদলে সীমিত বা কার্যত একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি। সাবেত বলেন, ‘আমি দেখি তারা কোনোমতে এক ধরনের সীমিত বা কার্যত চুক্তির দিকে এগোচ্ছে,তবে এটিকে ‘এমওইউ প্লাস’ হিসেবে ভাববেন না — ভাবুন ‘এমওইউ মাইনাস’।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


