ফের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে ৭ দেশের তেল স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেবে ইরান

ফের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে ৭ দেশের তেল স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেবে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশের তেল স্থাপনা, সমুদ্রতলের যোগাযোগ ক্যাবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত স্থাপনায় হামলা চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসিন রেজায়ি।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বন্ধে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া কট্টরপন্থি রাজনীতিক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মদি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নীতিগতভাবে নতুন করে হামলার বিষয়ে একমত হয়েছেন। তবে এ হামলায় সফলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘আমরা পরবর্তী সংঘাতকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছি। দুই বছরের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের কৌশল হলো, কোনো সীমারেখা না মানা।’

মোহাম্মদি আরো বলেন, ‘আমরা সংঘাতের সময় ও ভৌগোলিক পরিসর—দুই ক্ষেত্রেই প্রচলিত সীমা ভেঙে দেব। শত্রুপক্ষ যতটা ধারণা করছে, যুদ্ধ তার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং আরও বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলার জবাবে ইরান এ ধরনের অভিযান চালানোর কতটা সক্ষমতা রাখে এবং চীন বা রাশিয়ার কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিক কোনো সহায়তা পায় কি না, তা যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রেজায়ি বলেছেন, ‘যুদ্ধ শুরু হলে যোগাযোগ ক্যাবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সংঘাত আবার শুরু হলে আমাদের আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা থাকবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইরানের অর্থনৈতিক জীবনরেখায় হামলা চালানো হবে, অথচ এসব হামলা চালাতে সহায়তাকারী অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে নিরাপদ ও হামলার আওতামুক্ত রাখা হবে—এমন কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না।’

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে যৌথ হামলা চালানোর জন্য দেশটির সামরিক উপদেষ্টারা লক্ষ্যবস্তুর একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেছেন।

এদিকে ইরান, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনের সংকট নিয়ে সমন্বিত নীতি নির্ধারণে শুক্রবার ইস্তাম্বুলে বৈঠকে বসবেন তিনটি ইউরোপীয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিসরের প্রতিনিধিরা। তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।

বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে একই সময়ে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। জাহাজগুলো থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

আইআরজিসি আরো দাবি করেছে, প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণে আরও তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব জাহাজে হামলার সংখ্যা ও ঘটনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে ইরানে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ দশমিক ৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি।

গত চার মাসে সাতবার ইরানে নতুন করে হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। তবে কূটনৈতিক আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের বিষয়ে আলোচনা করছেন। এ অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, তেল অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হুমকির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে। ইরাকের আকাশসীমার ওপর দিয়ে উড্ডয়নসহ বিভিন্ন অভিযানের অনুশীলনও চলছে। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরাইলের কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি উড়েছে।

এ ছাড়া মধ্য ইরানের আরাক শহরের একটি বড় অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মাধ্যমে দেশটির ভেতরে অন্তর্ঘাতমূলক অভিযান চলার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

সোমবার ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। সেখানে সম্ভাব্য যৌথ হামলার সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা হয়। এ হামলা নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনায় কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু চান ইরান আগে হামলা চালাক। সোমবারের বৈঠকে তিনি হেগসেথকে এ মনোভাবের কথা জানিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি বিমানবাহী রণতরি, কয়েক হাজার মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান ও বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রেজা নাসরি সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের তৃতীয় ধাপ শুরু হলে তা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তিনি বলেন, ‘পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রিড, লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র, তেল শোধনাগার ও বন্দরগুলোতে আগুন জ্বলবে। কোটি কোটি মানুষ পানি ও বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়বে। আরব দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ইউরোপের দিকে ছুটবে।’

নাসরি আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মুখে পড়বে। সেনা মোতায়েন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এমনিতেই চাপে থাকা ইসরাইলের অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের ধকল সামলাতে পারবে না। আর ট্রাম্প এমন এক সংকটে আটকে পড়বেন, যা তার প্রেসিডেন্সির বাকি সময়কে গ্রাস করবে এবং পরবর্তী প্রশাসনের জন্য ধ্বংসস্তূপ রেখে যাবে।’

আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, ইরান তার বিভিন্ন সামরিক ও অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিটকে নির্দেশনা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে, বিশেষ করে ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যা ও বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে, ইরানের পাল্টা জবাব শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুও হামলার আওতায় আসবে।

এদিকে যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজতে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা চলতি সপ্তাহে আবারও আলোচনা করেছেন। আলোচনায় আগের কিছু প্রস্তাব নতুনভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ তুলে নেওয়া, জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শকদের বোমা হামলার শিকার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া এবং দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর বিনিময়ে ইরানকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...