আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার

আস্থায় চিড়: কেন নজিরবিহীন প্রশ্নের মুখে ভারতের নির্বাচন

আস্থায় চিড়: কেন নজিরবিহীন প্রশ্নের মুখে ভারতের নির্বাচন
ছবি: আল জাজিরা

ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশের পর দেশটির নির্বাচনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি স্বায়ত্তশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। বিগত দশকগুলোতে বিশাল পরিসর ও জটিলতার মধ্যেও সুষ্ঠুভাবে ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তবে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকায় চলমান পরিবর্তনের স্বচ্ছতা নিয়ে অন্য দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর আপত্তি উপেক্ষা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার তারা বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানান।

দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে মূলত ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ বলেই গণ্য করা হতো।

কিন্তু সাম্প্রতিক মাস ও বছরগুলোতে শীর্ষস্থানীয় বিরোধী নেতারা প্রথমবারের মতো নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভোট গণনার নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাশাপাশি, ভোটার হওয়ার বিষয়টি কি নিয়মের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়, নাকি ক্ষমতাসীনেরা খেয়ালখুশিমতো সিদ্ধান্ত নেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক

গত বছরের জুন থেকে দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া (এসআইআর) চলছে। এতে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় দরিদ্র, অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।

এসআইআরের আওতায় অনেক ভোটারকে পুরোনো জন্ম নথি, জমি বা শিক্ষার নথি দিয়ে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার প্রমাণ করতে হচ্ছে। ফলে নথিতে সামান্য বানান ভুল বা তথ্যের অমিল থাকলেও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, এর ফলে ভোটারদের ওপর নিজেদের ভোটাধিকার প্রমাণের দায়িত্ব বর্তেছে, যা ভারতের ঐতিহ্যগত নির্বাচনি ব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরনের পরিবর্তন।

অন্যদিকে বিজেপি ও এসআইআরের সমর্থকদের দাবি, এর মূল উদ্দেশ্য মৃত, ভুয়া ও অবৈধ অভিবাসী ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া।

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা পরিচালনার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইসিআইনেটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্রমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। গোয়ায় ভুল করে বাদ পড়া প্রায় ১০০ ভোটারের নাম পুনর্বহালের বিষয়ে স্থানীয় কর্মকর্তারা দিল্লিতে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সময়মতো সাড়া পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা বিকেন্দ্রীভূত ও স্বচ্ছ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিরোধীদের অভিযোগ

বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতে পারে। এতে ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানটির সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। কমিশন অবশ্য বলেছে, তিন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।

ভারতের গণতন্ত্রে এর প্রভাব কী

বিশ্লেষকদের মতে, এত দিন ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে প্রধান উদ্বেগ ছিল নির্বাচনগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে নাগরিক স্বাধীনতা, আইনের সমতা এবং নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠলে নির্বাচনের সময়কার গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতাও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশির মতে, নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বিশ্লেষক মিলান বৈষ্ণব মনে করেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের বর্তমান পদ্ধতি ভারতের দীর্ঘদিনের সেই নীতিকে বদলে দিতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল যোগ্য নাগরিককে ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক ভারতের নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর নতুন করে জনআস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন সামনে এনেছে।

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...