রাস্তায় ট্যাংকের মহড়া, ভবনের ওপর যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন আর সংসদ ভবনে বোমা হামলা—২০১৬ সালের ১৫ জুলাই এমন এক নজিরবিহীন রাতের সাক্ষী হয়েছিল তুরস্ক। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আহ্বানে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। ওই রাতে ১৮৪ জন বেসামরিক নাগরিকসহ মোট ২৫৩ জন নিহত হন। মাত্র কয়েক ঘণ্টার সেই ঘটনা গত এক দশকে তুরস্কের রাজনীতি, ক্ষমতা এবং পররাষ্ট্রনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান
তুর্কি সরকারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইসলামপন্থি ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেনের নেটওয়ার্ক এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিল। তবে ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত গুলেন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ওই ঘটনার পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, যা ২০১৮ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল।
এই সময়ে তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়। গুলেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হাজার হাজার সেনাসদস্য, বিচারক, পুলিশ, শিক্ষাবিদ ও সরকারি কর্মচারীকে গ্রেফতার বা বরখাস্ত করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় শত শত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়।
তবে সমালোচকদের দাবি, গুলেনপন্থিদের দমনের নামে এই অভিযান মূলত ভিন্নমত স্তব্ধ করতে ব্যবহার করা হয়েছে।
এরদোয়ানের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। ২০১৭ সালের গণভোটে সামান্য ব্যবধানে সংবিধানে বড় পরিবর্তন আনা হয়। এর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে শক্তিশালী নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো হয়।
সমর্থকদের মতে, এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করেছে।
তবে ফ্রিডম হাউজের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, এতে আইনপ্রণেতাদের ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।
ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক দোগান চেতিনকায়া বলেন, নতুন এই প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা মূলত খামখেয়ালিপনা ও অস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দ্বারা চিহ্নিত।
শুদ্ধি অভিযানের পর তুরস্কের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে। হাজার হাজার বিচারক-প্রসিকিউটরকে অপসারণ করায় বিচার বিভাগ স্বায়ত্তশাসন হারিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৬ সালের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান ১৬৩তম। সম্প্রতি প্রেসিডেন্টকে অপমানের অভিযোগে একজন জনপ্রিয় কমেডিয়ানও গ্রেফতার হয়েছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৫ সালের মার্চে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে আদালতের আদেশে প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি-এর নেতৃত্বেও হস্তক্ষেপ করা হয়, যাকে বিরোধীরা ‘বিচারিক অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তবে সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতেই এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে।
রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের অবসান
তুর্কি রাজনীতিতে এই ঘটনার অন্যতম বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হলো সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে দৃঢ়ভাবে সরকারের অধীনে আনা হয়েছে। মিলিটারি একাডেমি ও হাসপাতালগুলো পুনর্গঠন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক তুর্কি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনগণ সক্রিয়ভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করেছে, যা রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অভিভাবকত্বের যুগের অবসান ঘটিয়েছে।
নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতি
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে উত্তর সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট ও কুর্দি গোষ্ঠী ওয়াইপিজি-র বিরুদ্ধে তিনটি বড় সামরিক অভিযান চালায় আঙ্কারা।
একই সঙ্গে নেটের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আঙ্কারার বিরোধ তৈরি হয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০১৮ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তুরস্কের আলোচনা কার্যত স্থগিত রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


