১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সে উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, “গণতন্ত্র হলো সরকার পরিচালনার সবচেয়ে খারাপ ব্যবস্থা—অন্য সব ব্যবস্থাকে বাদ দিলে।”
মঙ্গলবার রাতে ইসরাইলের নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসতে শুরু করলে চার্চিলের সেই উক্তির কথা মনে পড়ে যায়। একদিকে আসছিল বুথফেরত জরিপের হিসাব, অন্যদিকে গণনা হচ্ছিল ভোট। এসব ফলাফল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আশঙ্কাকে কখনো পূরণ করছিল, কখনো ভেঙে দিচ্ছিল।
কিছু দিক থেকে এই নির্বাচন ছিল গণতন্ত্রের উদ্যাপন। রেকর্ডসংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন, যাদের মধ্যে ইহুদি ও আরব—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলেন। অনেকে শুধু ভোট দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে হাজার হাজার টাকা খরচ করে দেশে এসেছেন।
দেশজুড়ে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে প্রচারকর্মীদের মধ্যে ছিল প্রবল উৎসাহ। শেষ মুহূর্তে একজন ভোটারের মন পরিবর্তন করা কিংবা আরো একটি ভোট নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করেছেন তারা।
ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ এই নির্বাচনকে দেশটির সমাজের জন্য ‘সম্মানের প্রতীক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “ইসরাইলে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা কতটা গভীর, তা দেখা সত্যিই বিস্ময়কর।”
তবে এই নির্বাচন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দেশটিকে নতুন সরকার গঠনের সুস্পষ্ট পথ দেখাতে পারেনি। ফলাফল এমন হয়েছে যে, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো জোটই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
কেউ কেউ বলতে পারেন, ইসরাইলে এমন পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়।
দেশটিতে কখনো একক দলের সরকার গঠিত হয়নি। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক এবং খণ্ডিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি এমন যে, এখানে সরকার পরিচালনার জন্য প্রায় সব সময়ই জোট গঠন করতে হয়।
তবে অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, এবারের নির্বাচন দেশটির মৌলিক এবং সম্ভবত ক্রমবর্ধমান বিভক্তিগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এটি এমন কোনো গণভোট ছিল না, যেখানে একটি অভিন্ন লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ভোটাররা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।
বিভক্তির পুরোনো ক্ষত আরো গভীর?
এই বিভাজনের কিছু অবশ্য নতুন নয়। বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আগে থেকেই মতবিরোধ ছিল। এসব সংস্কারকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের শুরুর দিকে ব্যাপক বিক্ষোভও হয়েছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের প্রাণঘাতী হামলার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়েও মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। জিম্মিদের উদ্ধার করা হবে, নাকি হামাসকে ধ্বংস করাই হবে প্রধান লক্ষ্য—এ নিয়ে বিভক্তি ছিল।
এরপর গাজায় সংঘাতের মধ্যে ইসরাইলি রিজার্ভ সেনাদের হতাহত হওয়ার ঘটনা সামরিক বাহিনীতে অতি-ধর্মীয় ইহুদি তরুণদের বাধ্যতামূলক যোগদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অব্যাহতি নিয়ে উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দেয়।
তবে এবারের নির্বাচন কি ইসরাইলি সমাজের গভীরে থাকা বিভেদগুলোকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে?
ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে। এই বিভক্তি শুধু ধর্মবিশ্বাসের নয়, বরং সমাজব্যবস্থারও।
সরকার কি ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ভর্তুকি দেবে? কিছু পরিবারের সন্তানদের ইসরায়েলকে রক্ষা করতে জীবন উৎসর্গ করতে হবে, অথচ অন্য পরিবারের সন্তানদের তা করতে হবে না—এমন ব্যবস্থা কি গ্রহণযোগ্য?
ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ এখন অতি-ধর্মীয় ইহুদি। তাদের জীবনদর্শনের সঙ্গে তেল আবিবের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অভিজাত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নেও বিভক্তি রয়েছে।
নেতানিয়াহুর ক্ষতি, তবু সবচেয়ে বড় দল লিকুদ
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন হারিয়েছে। তবে তারপরও নেসেটে সবচেয়ে বড় দল হওয়ার পথে রয়েছে তারা।
দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল। নেতানিয়াহু অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে তিনি ইসরাইলকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে তদন্তের সুযোগ তিনি দিতে চান না।
প্রায় ১০ শতাংশ ভোটার ইহুদি আধিপত্যবাদী কট্টর ডানপন্থিদের সমর্থন দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের মতো রাজনীতিকেরা। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সময়ও স্মোত্রিচ গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন।
অন্যদিকে, ইসরাইলের মোট নাগরিকের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলো বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে। তারা প্রায় ১৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যার ফলে পার্লামেন্টে তাদের আসনসংখ্যা দুই অঙ্কের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
এরপর রয়েছে বিরোধী জোট। গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে মধ্যপন্থী, বামপন্থী ও ডানপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই জোট কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। অথচ অনেকের বিশ্বাস ছিল, দেশটির ভবিষ্যতের জন্য এই পরিবর্তন অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইজেনকট বলেছেন, জনগণ ‘পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে’।
এখন ইসরাইলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, এত বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিকে একত্র করে কোনো ধরনের সরকার গঠন করা। এ জন্য যে সিদ্ধান্ত ও সমঝোতা করতে হবে, সেগুলোর সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মৌলিক প্রশ্নও জড়িয়ে থাকতে পারে।
নেতানিয়াহু কি তার ধর্মীয় মিত্রদের ছেড়ে বিরোধী জোটের ডানপন্থিদের নিয়ে সরকার গঠন করতে রাজি হবেন? আর বিরোধী জোটের ওই নেতারা কি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি নিজেদের বিরূপ মনোভাব পাশে সরিয়ে রেখে তার সরকারে যোগ দিতে প্রস্তুত হবেন?
বিরোধী জোট কি নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় একটি অংশ থেকে সরে আসতে প্রস্তুত? আরব দলগুলো কি এমন একটি সরকারে যোগ দেওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি, যে সরকার কয়েক মাসের মধ্যেই ভেঙে পড়তে পারে?
বামপন্থি ডেমোক্র্যাট দলের নেতা ইয়াইর গোলান বিরোধী জোটকে আরব দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ইহুদি ভোট ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী বিভাজনকে আমরা আর মেনে নিতে পারি না।”
কিন্তু ইসরাইলের জনগণ কি এমন বাস্তবতা মেনে নিতে প্রস্তুত?
নেতানিয়াহুর প্রতি সহানুভূতিশীল ইসরাইলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমিত সেগাল বলেছেন, আরব ইসরাইলিদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ দুই পক্ষের ইহুদিদেরই মনে করিয়ে দিয়েছে যে, বছরের পর বছর বিভক্ত থাকার পর শেষ পর্যন্ত হয়তো তাদের একসঙ্গে বসতে শিখতে হবে।
ঐক্যের জায়গাটি কোথায়?
ঝুঁকিটা হলো, এই নির্বাচন ইসরাইলকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে নাগরিকদের মধ্যে কী বিষয়টি ঐক্য তৈরি করে, তা নিয়েই আরো সংশয় সৃষ্টি করেছে।
বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত এই জটিল সমাজকে একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে একত্রে ধরে রাখার সাধারণ উপাদানগুলো কী?
বিশ্বে স্বৈরাচারী সরকারের সংখ্যা বাড়ছে। এসব সরকার দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের সমালোচনা করে আসছে। তাদের যুক্তি, গণতন্ত্র দুর্বল ও স্বল্পস্থায়ী সরকার তৈরি করে। অনেক সময় ভঙ্গুর জোট সরকার নিজেদের ঐক্য ধরে রাখতেই হিমশিম খায়; জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা তো আরও কঠিন।
ইসরাইলেও এখন সরকার গঠনে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। এমনকি সরকার গঠন ব্যর্থ হলে দেশটিকে আবারও নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
জোট গঠনের আলোচনা শুরু করার প্রস্তুতিকালে প্রেসিডেন্ট হারজগ এই ঝুঁকির কথা সরাসরি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “গতকালের ঘটনার পর অবশ্যই আমাদের আরেক দফা নির্বাচন এড়াতে যা যা করা সম্ভব, তার সবই করতে হবে।”
বহু বছর ধরে ইসরাইল তার বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রকাশ পাওয়া বিভক্তিগুলো যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে দেশটিকে কি এখন ভেতরের বিপদ থেকেও নিজেদের রক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে?
চার্চিলের আরেকটি ভাষণের কথা এখানে মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্র শুধু ‘বিদেশ থেকে আসা বিপদের বিরুদ্ধে সুরক্ষা’ নয়। তার ভাষায়, এটি ‘দেশের ভেতরে আমাদের হুমকির মুখে ফেলে এমন বিপদ থেকেও সুরক্ষা দেয়, যেগুলো প্রায় সমান গুরুতর, কিন্তু আরও কাছের ও নিয়মিত’।
ইসরাইলের গণতন্ত্র কি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে?
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

