আলজাজিরার বিশ্লেষণ

ফিলিস্তিনি নাগরিকদের আনুগত্যের পরীক্ষা নিচ্ছে ইসরাইল

ফিলিস্তিনি নাগরিকদের আনুগত্যের পরীক্ষা নিচ্ছে ইসরাইল
ছবি: মিডল ইস্ট আই

ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে আরব ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণে ফিলিস্তিনি দলগুলো দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে। এই সাফল্য দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার ও আনুগত্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে ইসরাইলের ডানপন্থি রাজনীতিকেরা।

গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত শহর আরাবেহসহ বিভিন্ন এলাকায় আরব ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। শহরটির বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সি লামা ইয়াসিন বলেন, দীর্ঘদিন পর ভোটের দিন মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আশা দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই ইসরাইলি গণমাধ্যমে আরব ভোটারদের উপস্থিতিকে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরা হয়। চ্যানেল ১৪-তে এমনকি ‘নির্বাচনি সন্ত্রাসবাদ’ শব্দবন্ধও ব্যবহার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আরব ভোটকে ‘রাষ্ট্রের জন্য হুমকি’ আখ্যা

নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টি ও ইতামার বেন-গভিরসহ ডানপন্থি নেতারা আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ঘুস, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির মাধ্যমে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তোলেন। তবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ সংগঠিত কারচুপির কোনো প্রমাণ পায়নি।

ইয়াসিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে ইসরাইলি সমাজের দ্বিচারিতা তুলে ধরেন। তার বক্তব্য, আরবরা যখন ইসরাইলিদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, তখন তাদের ‘ভাই ও বন্ধু’ বলা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশ নিতে চাইলে তাদেরই ‘সন্ত্রাসের সমর্থক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

তিনি বলেন, ইসরাইল যখন চায়, তখন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সহাবস্থানের কথা বলে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা নীতিনির্ধারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে চাইলে তাদের উপস্থিতিকেই হুমকি হিসেবে দেখা হয়।

জাফায় বৈষম্য ও উচ্ছেদের দীর্ঘ ইতিহাস

তেল আবিব-জাফার আজামি এলাকায় ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস এই বৈষম্যের বাস্তবতা তুলে ধরে। ১৯৪৮ সালের আগে জাফায় প্রায় এক লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করতেন। নাকবার পর সেখানে মাত্র চার হাজারের মতো ফিলিস্তিনি অবশিষ্ট ছিলেন। তাদের আজামি এলাকায় সীমাবদ্ধ করে সামরিক শাসনের অধীনে রাখা হয়।

স্থানীয় নাগরিক অধিকারকর্মী ও সাবেক সিটি কাউন্সিলর ওমর সিকসিক বলেন, পরবর্তীতে সামরিক শাসন উঠে গেলেও ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের ঘটনা অব্যাহত থাকে।

সিকসিকের মতে, নির্বাচনে ভোট দেওয়াই ইসরাইলি ইহুদি নাগরিকদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সমতার একমাত্র ক্ষেত্র। কিন্তু আরবরা যখন সরকারের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তখন তাদের ভোটকেই রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক বলা হয়।

তিনি আরও বলেন, ইসরাইলের হাসপাতাল, পরিবহন ও নির্মাণ খাতে আরবরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের সমান নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে গিয়ে পরিচয় বিসর্জনের অভিজ্ঞতা

ইয়াসিন নিজেও ইসরাইলি সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য একসময় নিজের ফিলিস্তিনি পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। হিব্রু ভাষায় দক্ষতা অর্জন করে তিনি ইহুদি-প্রধান কর্মপরিবেশে চাকরি নেন। প্রকাশ্যে আরবি বলতেন না, এমনকি আরব দলগুলোর পরিবর্তে বামপন্থি মেরেতজ পার্টিকে ভোট দিতেন।

সহকর্মীরা তার নাম ‘লামা’ পরিবর্তন করে ‘ইয়াসমিন’ রাখার প্রস্তাব দেন। কারণ, তাদের কাছে তার চেহারার সঙ্গে ‘আলাদিন’ চলচ্চিত্রের জেসমিন চরিত্রের মিল ছিল। দেড় বছর ধরে তাকে ওই নামেই ডাকা হয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর কর্মস্থলে সহকর্মীরা তার সঙ্গে স্বাভাবিক সৌজন্য বিনিময়ও বন্ধ করে দেন। ইয়াসিনের উপলব্ধি, বৈষম্য বজায় রেখে কখনো প্রকৃত সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

বর্তমানে আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের জননীতি বিভাগের পরিচালক হিসেবে তিনি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অধিকার ও আরব অধ্যুষিত এলাকায় অপরাধ দমনের বিষয়ে কাজ করছেন। তবে নেসেটের বিভিন্ন কমিটির শুনানিতে তাকে কথা বলতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ধরপাকড় ও তদন্ত

নির্বাচনের পর আরব রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান ও তদন্তের ঘটনাও বেড়েছে।

গত ৩ নভেম্বর রাতে জাফায় সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী আবেদ আবু শেহাদেহর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে নিরাপত্তা বাহিনী। তার বিরুদ্ধে ‘বিদেশি এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালত তাকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত আটক রাখার নির্দেশ দেন।

এ ছাড়া দক্ষিণ ইসরাইলে রা’আম পার্টির পক্ষে ভোট কেনার পরিকল্পনার অভিযোগে সাত বেদুইনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দলটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আরব রাজনৈতিক নেতা আয়মান ওদেহর বিরুদ্ধেও বিদেশি উৎস থেকে অর্থ নিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত। ওদেহ এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক হয়রানি বলে অভিহিত করেছেন।

ইহুদি-আরব সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ থাবেত আবু রাসের মতে, আরব রাজনৈতিক দলগুলো এখন কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং ইসরাইলের পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে।

সরকার গঠনে আরব দলগুলোকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা

নির্বাচনে ১৯টি আসন পাওয়ায় আরব দলগুলো বিরোধী জোটের সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ পায়। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনয়নের পক্ষে ৬৭ জন সংসদ সদস্য সমর্থন জানান, যাদের মধ্যে আরব দলের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন।

আরব দলগুলো নেতানিয়াহু সরকারকে সরানো, নেসেটের স্পিকার আমির ওহানাকে অপসারণ এবং ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তবে আবু রাসের আশঙ্কা, আইজেনকটের বিরোধী জোট আরব দলগুলোর সমর্থনকে কেবল সাময়িক রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে চাইছে। সরকার গঠনের পর তাদের পাশে রাখা হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

‘আমাদের হাল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই’

নির্বাচনের পর আজামি এলাকার অনেক বাসিন্দার মধ্যে হতাশা ফিরে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা নাদিয়া বলেন, রাস্তায় প্রতিবাদ করলে গ্রেপ্তার হতে হয়, আর ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানালে তা উপেক্ষা করা হয়।

ইয়াসিনের মতে, ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সামনে লড়াই চালিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তার ভাষায়, ‘আমাদের হাল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা এই লড়াই না করলে আর কেউ করবে না।’

নির্বাচনে ১৯টি আসন অর্জনের মধ্য দিয়ে আরব নাগরিকদের মধ্যে যে রাজনৈতিক ক্ষমতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে, তা সহজে বিসর্জন দেওয়া সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি।

সম্প্রতি তেল আবিবের একটি ক্যাফেতে বসে ইয়াসিন ইসরাইলি উদারপন্থিদের মধ্যেও ফিলিস্তিনিদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে অনীহা লক্ষ করেছেন। তার উপলব্ধি, যারা আরব প্রতিনিধিদের সরকারে দেখতে চান না, তারা আসলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদেরও সমানভাবে গ্রহণ করতে চান না।

তিনি বলেন, ‘তারা যদি আমার প্রতিনিধিদের না চায়, তাহলে এর অর্থ তারা আমাকেও চায় না।’

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...