গাজায় জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর

গাজায় জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে গাজা দখলে নিয়ে এ অঞ্চলকে ‘গাজা রিভেরা’য় পরিণত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের স্থানীয়ভাবে অন্যত্র সরে যাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। ট্রাম্পের এমন পরিকল্পনা বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় তোলে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। ফিলিস্তিনি, আরব দেশ, জাতিসংঘ এবং অধিকার কর্মীরা একে স্পষ্টত ‘জাতিগত নিধন’ বলে অভিহিত করেছিল।

দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় গত ২৫ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তিনি বলেছিলেন, দীর্ঘ মেয়াদে মিসর এবং জর্ডান সরকারের উচিত গাজাবাসীকে গ্রহণ করা। আর এ নিয়ে জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, গাজা এখন আক্ষরিক অর্থেই একটি ধ্বংসস্তূপ। তাই গাজাবাসীকে অন্য আরব দেশের গ্রহণ করা উচিত যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে এবং শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তীব্র সমালোচনা এবং নিন্দার পরও ২৭, ৩০ এবং ৩১ জানুয়ারি মোট তিনবার একই প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি আবারো বলেছিলেন, মিসর ও জর্ডান তার প্রস্তাব গ্রহণ করবে। যদিও এই দুই দেশ শুরুতেই ট্রাম্পের এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল।

৪ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে প্রথম বৈঠকের আগে আবারও গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, মিত্র দেশ ইসরাইলের আক্রমণে গাজা এখন বিধ্বস্ত। তাই ফিলিস্তিনিদের গাজা ছেড়ে অন্যত্র সরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কারণ বর্তমান গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানকার জনগণ হত্যার শিকার হচ্ছে ও চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

গাজাবাসীর উদ্দেশে ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল, তিনি চান ফিলিস্তিনিরা বসবাসের জন্য সুন্দর জায়গা পাওয়ার যোগ্য, তাদের নতুন আবাসস্থল গড়তে আর্থিক সহায়তার কথাও বলেছিলেন ট্রাম্প।

তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নিজ ভূখণ্ড থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা বেআইনি ও অবৈধ।

পরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, আমেরিকা গাজা দখলে নেবে এবং সেখানকার অবিস্ফোরিত বোমা এবং অস্ত্র ধ্বংস করে সবকিছু পরিষ্কার করে দেবে। গাজা পুনর্নির্মাণ এবং বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আবাসনের জন্য অর্থ প্রদান করবে বলেও জানান তিনি।

পরে ৫ ফেব্রুয়ারি তার বক্তব্য থেকে কিছুটা সরে আসেন ট্রাম্প। ৬ ফেব্রুয়ারি ট্রুথ সোশ্যালে তিনি বলেছিলেন, গাজায় আমেরিকার সেনা পাঠানোর কোনো প্রয়োজন নেই। যুদ্ধ শেষে ইসরাইল গাজা উপত্যকা আমেরিকার হাতে তুলে দেবে। ১০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প বলেছেন ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাবর্তনের কোনো অধিকার নেই। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন ফিলিস্তিনিরা আর কখনো গাজায় প্রত্যাবর্তনের অধিকার পাবে না।

১১ ফেব্রুয়ারি জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গাজাবাসীকে জর্ডানে আশ্রয় দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, তারা গাজা দখলে নেবে, কারণ এটি একটি বিধ্বস্ত এলাকা। তবে জর্ডানের রাজা ট্রাম্পের এ প্রস্তাব পুরোপুরি নাকচ করে দেন।

এরপর ৭ এপ্রিল ও ৭ জুলাই নেতানিয়াহুর সঙ্গে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার বৈঠকেও গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরাতে একই কথা বলেছিলেন ট্রাম্প।

এদিকে, গাজাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা বা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার বিষয়টিকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন নেতানিয়াহু। স্থানীয় সময় সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠকের সময় এসব মন্তব্য করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনিরা নিজেদের শাসন করতে পারবে তবে সার্বভৌম ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে না। ইসরাইল শপথ করেছে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র কখনোই প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন