ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে ইউক্রেন!

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে ইউক্রেন!
এআই দ্বারা নির্মিত ছবি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের ওপর সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ আপাতত স্থগিত রাখলেও সংঘাতের অবসান ঘটেনি বলে মনে করছেন সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

সম্প্রতি কাস্পিয়ান সাগরে ইরান-সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজে ইউক্রেনীয় হামলার পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে—তবে কি এবার ইউক্রেনও ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টে পরিণত হচ্ছে?

বিজ্ঞাপন

গত ২৫ জুলাই কাস্পিয়ান সাগরে ইরান-সংযুক্ত একটি জাহাজে হামলার খবর প্রকাশ্যে আসে। ঘটনার পর থেকে প্রশ্ন উঠছে, ওয়াশিংটন-তেহরান সংঘাতের দ্বিতীয় ধাপে কাস্পিয়ান অঞ্চল কি নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে?

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তুঙ্গে থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার প্রচলিত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিশেষ করে কৌশলগত অস্ত্রের মজুত কমে আসা এবং যুদ্ধের বিপুল ব্যয়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত কৌশলগত বিরতির পথ বেছে নিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনের হামলাকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। ইউক্রেন ও ইরানের মধ্যে কোনো সরাসরি স্থলসীমান্ত না থাকলেও কাস্পিয়ান সাগরে আক্রমণের ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে—ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকট এবার একই সুতোয় গাঁথা হচ্ছে।

কাস্পিয়ান সাগরে হামলার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কঠোর পালটা পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি।

সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইউক্রেনের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর এ ধরনের আক্রমণ অব্যাহত থাকলে তেহরানকে তাদের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত ও সমুদ্রসীমায় বাড়তি সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ড্রোন বহর ও গোয়েন্দা সক্ষমতার একটি বড় অংশ উত্তর ফ্রন্টে সরিয়ে নিতে হবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মূল রণক্ষেত্রে তেহরানের সামরিক মনোযোগ ও একক সামর্থ্য কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য এটিই বড় কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে। তাদের মূল লক্ষ্য ইউক্রেনের মাধ্যমে ইরানকে সরাসরি পরাজিত করা নয়; বরং ইরানকে একাধিক ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখা, যাতে দেশটি এক জায়গায় সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে না পারে।

এদিকে কাস্পিয়ান সাগরে ওই আক্রমণের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটনে কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা ব্যাপক বাড়ে। একই দিনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পৃথকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন।

নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ইরানের ওপর কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার বিষয়টি জোর পায়। অন্যদিকে জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনায় ইউক্রেনের সামরিক প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বাড়ানোর দিকটি প্রাধান্য পায়।

এর আগেই অবশ্য ন্যাটোর মার্কিন স্থায়ী প্রতিনিধি ম্যাথিউ হুইটেকারের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেনে ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের লাইসেন্সভিত্তিক উৎপাদন এবং ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন জেলেনস্কি। পরে মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘রেথিয়ন’-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার একই বিষয়ে আলোচনা হয়।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিষয়টি কেবল ইউক্রেনকে অতিরিক্ত অস্ত্র দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইউক্রেনকে নিজেদের সামরিক প্রযুক্তি উৎপাদনব্যবস্থার অংশ বানিয়ে নিতে চাইছে। পাশাপাশি রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের যুদ্ধে অভিজ্ঞতা অর্জন করা ইউক্রেনের উন্নত ড্রোন প্রযুক্তিকে মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত করার প্রক্রিয়া চলছে।

রাশিয়ার সঙ্গে টানা যুদ্ধে ইউক্রেন ইতোমধ্যে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা, ছদ্মবেশী নাশকতা, গোয়েন্দা অভিযান এবং শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে নিখুঁত আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ইউক্রেনের পরিচালনা করা ‘অপারেশন স্পাইডার ওয়েব’-এর মতো অভিযানের সাফল্য প্রমাণ করে, হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।

তাই বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইউক্রেন ও ইরানের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধ শুরু হলেও তা প্রচলিত স্থলযুদ্ধ বা ট্যাংক যুদ্ধের রূপ নেবে না। বরং দূরপাল্লার ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ছায়াযুদ্ধ ও গোপন গোয়েন্দা অভিযানই হবে এর মূল হাতিয়ার।

তবে এই নতুন সমীকরণ গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকট একীভূত হলে তা একটি অনিয়ন্ত্রিত বিশ্ব সংকটে রূপ নিতে পারে। এর ফলে কৃষ্ণসাগর, ককেশাস ও কাস্পিয়ান অঞ্চলজুড়ে নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক মেরুকরণ তৈরি হবে, যার সরাসরি প্রভাব তুরস্কসহ পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর পড়বে।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন