জনগণের দুর্ভোগের সময়েও রাজনীতিকদের বিলাসী জীবনযাপন

জনগণের দুর্ভোগের সময়েও রাজনীতিকদের বিলাসী জীবনযাপন

পাকিস্তানে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সময়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিপরীতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। সাধারণ মানুষ যখন চিকিৎসা, খাদ্য, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন শাসকগোষ্ঠীর জীবনযাপনে সেই সংকটের প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি ফার্মেসিতে একজন নারী প্রায় ৪ হাজার পাকিস্তানি রুপির ওষুধের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে প্রায় ১ হাজার রুপির ওষুধ ফেরত দেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঋণের বোঝা, আয়ের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ বিল, গাড়ির বদলে মোটরসাইকেল ব্যবহার এবং কম দামের খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ার মতো অভিজ্ঞতা এখন অনেক পরিবারের বাস্তবতা।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানে মানুষ এখন এমনকি পেট্রলের দাম শিগগির ৪০০ রুপি ছাড়াবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা করছে। সরকার পরিস্থিতির প্রভাব বুঝতে পেরে ভর্তুকি কর্মসূচি পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছে। তবে প্রশ্ন, পেট্রলের ওপর আরোপিত কর কমানোর প্রসঙ্গ উঠলেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের প্রসঙ্গ সামনে আসে, অথচ ব্যবসায়ী ও কৃষি আয়ে যথাযথ কর আরোপ কিংবা আবাসন খাতে কর-সুবিধা কমানোর ক্ষেত্রে একই দৃঢ়তা দেখা যায় না।

তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পাম্পে জ্বালানি কেনার খরচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ বিলসহ সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে মানুষের ইতোমধ্যে দুর্বল ক্রয়ক্ষমতার ওপর নতুন মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহত্তর মানবিক সংকটে পাকিস্তানের শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ৪৬ থেকে ৫৮; এই হার পুরো অঞ্চলের তুলনায় বেশি এবং আফগানিস্তান ও ইয়েমেনের কাছাকাছি। জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ পর্যাপ্ত ক্যালরি গ্রহণ করতে পারে না এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু অপুষ্টি ও খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগছে। এসব পরিসংখ্যান সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের ফল নয়; এগুলো পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সমস্যার চিত্র।

এই বাস্তবতার বিপরীতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জীবনযাপন বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সম্পর্কে যথেষ্ট সহমর্মিতা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে। মানুষ যখন মানবিক সংকটে রয়েছে, তখন সরকারগুলো নিজেদের বিলাসী জীবনযাপনও কি কিছুটা সংযত করতে পারে না?

প্রধানমন্ত্রী ও তার ডেপুটির বিদেশ সফর নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। রাজধানীর একটি হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে নবজাতকের মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটার সময়ও প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যখন দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সংকটপূর্ণ, তখন দেশের সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নয় কি?

রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্য সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগত সফরে ইউরোপে গেছেন এবং ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ করেছেন। ব্যাপক সমালোচনার পর তারা জানান, সফরের ব্যয় ব্যক্তিগতভাবে বহন করা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকটের সময়ে এমন প্রদর্শনও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে জনগণের দূরত্বের বিষয়টি সামনে আনে।

রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত জীবন ও ব্যক্তিগত সম্পদের অধিকার রয়েছে। আপত্তি মূলত সেই জীবনযাপনের প্রকাশ্য প্রদর্শন নিয়ে। বিশেষ করে ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপের সময়ে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান বা বিলাসী জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসাকে তিনি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব হিসেবে দেখেছেন।

নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন দাবি করা রাজনীতিকদের দায়িত্ব অন্য ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের তুলনায় আলাদা। কারণ তারা জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসেন এবং জনগণের কাছে নিজেদের জবাবদিহির দাবি করেন। তাই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীলতা, সংযম এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতা তাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন