২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হলে লাখো ফিলিস্তিনি ঘরছাড়া হয়। অনেককে বাধ্য হয়ে দক্ষিণ গাজার দিকে চলে যেতে হয়। কেউ ঘর ছেড়েছে খালি হাতে। আবার কেউ শেষ মুহূর্তে সঙ্গে নিয়েছে এমন কিছু, যা ফেলে যেতে পারেনি—বই, বাদ্যযন্ত্র, পোষা প্রাণী, খেলনা কিংবা কোনো স্মৃতিচিহ্ন।
২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর সেখানে অন্তত ৭৪ হাজার ১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৯ জন আহত হয়েছে।
বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার মধ্যেও গাজার কয়েকজনের কাছে এসব সামগ্রী হয়ে উঠেছে তাদের ফেলে আসা জীবনের সঙ্গে যোগাযোগের শেষ অবলম্বন।
৫০০ বই থেকে সঙ্গে নিয়েছিলেন ২০০
উত্তর গাজার বেইত হানুনে ৩০ বছর বয়সি ওমর আবদেল হাকিম হামাদ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর মধ্যরাতে বাস্তুচ্যুত হওয়ার নির্দেশ পান। বাইরে তখন তীব্র বোমাবর্ষণ চলছিল। তবু তিনি কিছুটা সময় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার আশঙ্কা ছিল, হয়তো আর কখনো বাড়িতে ফিরতে পারবেন না।
প্রথমেই তার মনে পড়ে নিজের বইয়ের সংগ্রহের কথা। প্রায় ৫০০ বইয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে তিনি সঙ্গে নিতে পেরেছিলেন প্রায় ২০০টি। পুরোনো ও দুর্লভ বইগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন তিনি।
৩০ অক্টোবর ২০২৩-এ বেইত হানুন ছাড়ার পর ওমর ১৩ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রথমে গাজা শহর, পরে মধ্য গাজার মাগাজি শরণার্থীশিবিরে যান। এখনো সেখানেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছেন।
ওমরের কাছে বইগুলো শুধু বই নয়। তার ভাষায়, এগুলো তার সত্তার অংশ। ১৫ বছর বয়সে পড়ার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল তার। সঙ্গে নেওয়া বইগুলোর মধ্যে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত ‘কালিলা ওয়া দিমনা’র একটি সংস্করণও রয়েছে।
গাজায় দীর্ঘ সময় চলা দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিতে একসময় পুরো বইয়ের সংগ্রহের বিনিময়ে এক-দুই কেজি আটা নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন ওমর। তবে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ বই ধরে রাখতে পেরে তিনি কৃতজ্ঞ।
বর্তমানে গাজা শহরের তার ‘ফিনিক্স লাইব্রেরি’তে প্রায় ৭ হাজার বই রয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৩ হাজার বই। আরো ৪ হাজার বই পরে কেনা হয়েছে।
দুটি কুকুরের মধ্যে বেঁচে রইল একটি
গাজার আল-জালা এলাকায় নিজের বাড়ি ছাড়ার সময় ৩০ বছর বয়সি শাহদ আবু খোসা সঙ্গে নিয়েছিলেন তার দুই কুকুর—লিলি ও ববি।
২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর শুরু হওয়া সেই যাত্রায় তারা প্রথমে আল-শিফা হাসপাতাল, পরে গাজা শহরের দক্ষিণে তাল আল-হাওয়া, একটি বাড়ি এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে যান।
বোমাবর্ষণের শব্দে লিলি ভয় পেয়ে লুকিয়ে পড়ত। খাবারের সংকটে ববি অনাহারে মারা যায়।
শাহদ বলেন, লিলিকে ফেলে যাওয়ার কথা তিনি কখনো ভাবেননি। তার কাছে লিলি পরিবারেরই একজন।
দুর্ভিক্ষের সময় পরিবারের জন্য যে খাবার থাকত, লিলিকেও তার অংশ দেওয়া হতো। ডাল ও রুটিও খেত সে। একসময় কুকুরকে ভয় পেলেও তার বোন মিসর থেকে লিলি ও ববিকে নিয়ে আসার পর সেই ভয় কেটে যায়।
লিলির সঙ্গে শাহদের বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়। তার সঙ্গে থাকত, খাবার ভাগ করে নিত। শাহদের বিপদ আঁচ করতে পারলে তাকে রক্ষা করার চেষ্টাও করত লিলি।
শাহদের আশা, গাজার সব পোষা প্রাণীর জন্য একদিন নিরাপদ জায়গা হবে—যেখানে তাদের খাবার, পানি ও ঘুমানোর জায়গা থাকবে; ভয় ও ক্ষতি থেকে দূরে, কেউ তাদের ফেলে দেবে না।
ধ্বংসস্তূপ থেকেও তুলে নিয়েছিলেন বাদ্যযন্ত্র
বেইত লাহিয়ার বাড়ি ছাড়ার সময় ১৬ বছর বয়সি ইয়াসিন আল-কুবত সঙ্গে নিয়েছিলেন তার উড। ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর পরিবারটি মধ্য গাজার আজ-জাওয়াইদায় চলে যায়। পরে তাদের বাড়িতে বোমা হামলা হলে বাদ্যযন্ত্রটি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে।
ইয়াসিন ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে উডটি ব্যবহার করছিলেন। পাশের এক উডবাদকের কাছ থেকে তিনি বাজানো শিখেছিলেন।
পরে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উডটি উদ্ধার করতে সক্ষম হন ইয়াসিন। আবার বাজানো শুরু করেন।
বাস্তুচ্যুতি শিবিরের শিশুদের জন্যও তার বাদ্যযন্ত্র হয়ে ওঠে স্বস্তির মাধ্যম। ইসরাইলি ড্রোনের শব্দে শিশুরা ভয় পেলে তিনি উড বাজান। এতে যুদ্ধের ভয় থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও তাদের মন অন্যদিকে ফেরে।
ইয়াসিনের স্বপ্ন, গাজার বাইরে গিয়ে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করা, বড় মঞ্চে বাজানো এবং নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য একটি পেশাদার উড কেনা। আপাতত তার কাছে এই বাদ্যযন্ত্রটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তার ভাষায়, ‘আমাদের এখনো দেওয়ার মতো সুন্দর কিছু আছে।’
শেষ ক্লাসের স্মৃতি হয়ে রইল একটি টি-শার্ট
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই গাজার তাল আল-হাওয়া এলাকার বাড়ি ছাড়ার সময় ২০ বছর বয়সি হুদা হেলাসা সঙ্গে নিয়েছিলেন একটি টি-শার্ট।
টি-শার্টটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত ‘অ্যাকসেস মাইক্রোস্কলারশিপ প্রোগ্রাম’-এর। এটি তরুণদের ইংরেজি ভাষা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা দেয়। ২০২৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তাদের শেষ ক্লাসে সহপাঠীরা টি-শার্টটিতে নিজেদের স্বাক্ষর করেছিলেন। দুই বছর পর ২৭ সেপ্টেম্বর হুদার স্নাতক হওয়ার কথা ছিল।
যুদ্ধের প্রথম দিন বাড়ি ছাড়ার সময় টি-শার্টটির কথাই প্রথম তার মনে পড়ে। প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সেটি ব্যাগে তুলে নেন। কয়েক দিন আগেই শেষ হওয়া জীবনের একটি অংশের স্মৃতি ধরে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি।
হুদা ও তার পরিবার প্রথমে গাজা শহরে তাঁর নানির বাড়িতে যান। পরে দক্ষিণে বাস্তুচ্যুত হন। পথের কিছু অংশ হেঁটেই পাড়ি দেন। শেষ পর্যন্ত রাফাহে পৌঁছান।
২০২৪ সালের মে মাসে তাদের আবার খান ইউনিসে যেতে হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গাজায় ফিরে এসে তারা দেখেন, বাড়িটি পুরোপুরি পুড়ে গেছে।
হুদার ভাষায়, তাদের আগের জীবনের আর কিছুই সেখানে ছিল না—কোনো জিনিসপত্র, ছবি বা স্মৃতি নয়; শুধু কালো হয়ে যাওয়া দেয়াল।
এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে আবার বাস্তুচ্যুত হন তারা। রামাল ও তাল আল-হাওয়ার পর সেপ্টেম্বরে আজ-জাওয়াইদা এবং অক্টোবরে আবার গাজায় ফেরেন। বর্তমানে তারা তাল আল-হাওয়ায় রয়েছেন।
হুদার কাছে টি-শার্টটি যুদ্ধের আগের জীবনের সঙ্গে একটি যোগসূত্র। সেই জীবনে ছিল পড়াশোনা, বন্ধুত্ব ও নানা অভিজ্ঞতা।
খেলনাই হয়ে উঠেছিল আট বছরের শিশুর নিরাপদ আশ্রয়
গাজা শহর থেকে মধ্য গাজার নুসেইরাতে পালানোর সময় আট বছর বয়সি মাহমুদ হুসেইন তার খেলনার ব্যাগ সঙ্গে নেওয়ার জন্য জেদ করেছিল।
যুদ্ধের সময় পরিবারটি প্রায় সাতবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রতিবারই মাহমুদ খেলনা ছাড়া যেতে চাইত না। তার মা অনেকবার খেলনাগুলো রেখে যাওয়ার বোঝালেও সে রাজি হয়নি।
এক দফা যুদ্ধবিরতির সময় তাঁরা বাড়িতে ফিরে দেখেন, সেটি আংশিক ধ্বংস হয়েছে। মাহমুদের ঘরও ধ্বংস হয়ে যায়। নষ্ট হয় তার বিছানা, আলমারি ও বেশির ভাগ খেলনা।
মায়ের ভাষায়, ঘরটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনায় মাহমুদ গভীরভাবে আঘাত পেয়েছিল। এখনো সে হারিয়ে যাওয়া খেলনা ও নিজের ঘরের কথা মনে করে।
মাহমুদের মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের কারণে একটি স্নায়বিক সমস্যা রয়েছে। যুদ্ধের আগে দুই বছর ধরে প্রতিদিন ওষুধ খেত সে। যুদ্ধ শুরুর দুই দিন আগে ওষুধ খাওয়া বন্ধ হয়েছিল। নতুন চিকিৎসা শুরু করার কথা থাকলেও যুদ্ধের কারণে তা আর সম্ভব হয়নি।
তার প্রতি মাসে স্নায়বিক পরীক্ষা করানোও প্রয়োজন। কিন্তু গাজায় এখন সেই পরীক্ষার সুযোগ নেই।
মা জানান, যুদ্ধের মধ্যে মাহমুদের খেলনাগুলোই হয়ে উঠেছিল তার ‘নিরাপদ আশ্রয়’। ভয়, চাপ ও দুঃখ তার খিঁচুনি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই খেলনা নিয়ে খেলা ও সেগুলো ঘিরে গল্প তৈরি করা তাকে যুদ্ধের পরিবেশ থেকে কিছুটা দূরে থাকতে এবং শান্ত থাকতে সাহায্য করেছে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

