সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। সেই মানুষ জন্ম নেয় তার বংশগত ভালো আর মন্দ গুণ নিয়ে; এমনকি অসুস্থতা বা বিভিন্ন রোগ নিয়েও। চিকিৎসাবিজ্ঞান অবশ্য অনেক আগেই এসব তথ্য উন্মোচন করেছে। তবে এবার আরো ভিন্ন কিছু হাজির করা হয়েছে। এবার বংশগত রোগবিহীন শিশুর জন্মও দিয়েছে। বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর। ঘটনাটি ঘটেছে ব্রিটেনে।
সেখানকার বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যেখানে বংশগত মারাত্মক ও জটিল রোগবিহীন শিশু জন্ম নেবে। আর এজন্য একজন মা এবং বাবার ডিম্বাণু ও শুক্রাণুকে দ্বিতীয় নারীর ডিম্বাণুর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে তিনজনের জিনগত উপকরণ ব্যবহার করে ৮ শিশুর জন্ম হয়েছে। এসব শিশু বংশগত কোনো দুরারোগ্য রোগ শরীরে বহন করবে না। বিশেষ করে দুরারোগ্য মাইটোকন্ড্রিয়াল রোগমুক্ত হয়ে ওই শিশুরা জন্ম নিয়েছে বলে দাবি বিজ্ঞানীদের।
বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
বিবিসি বলছে, ব্রিটেনে এ পদ্ধতিটি এক দশক ধরে আইনগতভাবে বৈধ। তবে এবারই প্রথম দুরারোগ্য মাইটোকন্ড্রিয়াল রোগমুক্ত শিশুদের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছেন চিকিৎসকরা। আর এর মধ্য দিয়েই পদ্ধতিটি কার্যকর বলে দাবি করেছেন তারা।
সাধারণত ত্রুটিপূর্ণ মাইটোকন্ড্রিয়ার কারণে শিশু গুরুতর শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে জন্ম নেয় এবং জন্মের কিছুদিন পর মারা যায়। আর বাবা-মা জানেন যে, তাদের ত্রুটির কারণেই সন্তানের মধ্যেও এই রোগ স্থানান্তরিত হবে এবং তাদের সন্তান মৃত্যুঝুঁকিতে থাকবে। মায়ের কাছ থেকে সন্তানের শরীরে জটিল জিনগত রোগের বিস্তার ঠেকাতেই মূলত নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা।
এ অবস্থা মূলত মা থেকে শিশুর মধ্যে সঞ্চারিত হয়, যার ফলে শরীরের শক্তি নষ্ট হয়। এ পদ্ধতিতে মায়ের দেহ থেকে আসা ত্রুটিপূর্ণ মাইটোকন্ড্রিয়া প্রতিস্থাপন করা হয় অন্য একজনের সুস্থ মাইটোকন্ড্রিয়া দিয়ে।
মাইটোকন্ড্রিয়া হলো মানব দেহের প্রায় প্রতিটি কোষের ভেতরের ক্ষুদ্র কাঠামো। এর মাধ্যমে মানুষ শ্বাস নেয়, শ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন নিয়ে খাদ্যকে জ্বালানি হিসেবে শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ত্রুটিপূর্ণ মাইটোকন্ড্রিয়া শরীরে হৃৎস্পন্দন বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি না রেখে মস্তিষ্কের ক্ষতি, খিঁচুনি, অন্ধত্ব, পেশির দুর্বলতা এবং অঙ্গ বিকল করে দেয়। প্রায় পাঁচ হাজার শিশুর মধ্যে একজন মাইটোকন্ড্রিয়াল রোগ নিয়ে জন্ম নেয়।
এ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া শিশুরা তাদের বেশিরভাগ ‘ডিএনএ’, জেনেটিক ব্লুপ্রিন্ট পেয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে বাবা-মায়ের কাছ থেকে। মাত্র শূন্য দশমিক এক শতাংশ ডিএনএ পেয়েছে দাতা দ্বিতীয় নারীর কাছ থেকে।
মজার বিষয় হলো, এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া পরিবারগুলো গোপনীয়তা রক্ষার জন্য প্রকাশ্যে কোনো কথা বলছে না। তবে নিউক্যাসল ফার্টিলিটি সেন্টারের মাধ্যমে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছে।
বহুদিন ধরে নিঃসন্তান থাকার পর এ পদ্ধতিতে কন্যাসন্তান জন্ম দেন এক নারী। সেই কন্যাসন্তানের মা কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে তার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার পর এই চিকিৎসা তাদের আশা জুগিয়েছিল। তারপর তার কোল আলো করে এক কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি ও স্থানীয় হাসপাতালগুলোর গবেষণায় এক দশক আগে এ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে। এরপর ২০১৭ সালে এনএইচএসে একটি বিশেষায়িত ইউনিট চালু হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

