নিউজিল্যান্ডে ওয়ার্কিং হলিডে ভিসায় যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই এরিন ক্ল্যাট বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি দেশটিকেই স্থায়ী আবাস বানাতে চান। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার সময় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নানা কারণে তিনি ‘অন্য কোথাও থাকার’ খোঁজ করছিলেন। ক্ল্যাট বলেন, নিউজিল্যান্ডে এসে সবকিছু যেন ঠিকঠাক মিলিয়ে গেল।
এক দশক পর, ৩৪ বছর বয়সে এসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। চলতি বছরের শুরুতে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নাগরিকত্ব ত্যাগের ফি প্রায় ৮০ শতাংশ কমানোর আগেই তিনি ২,৩৫০ ডলার পরিশোধ করে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের শপথ পাঠ করেন।
উইসকনসিনে দুগ্ধ খামারে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় নিউজিল্যান্ডেও একই ধরনের কাজ পান তিনি। সেই কাজের সুবাদে পাওয়া ‘এসেনশিয়াল স্কিলস’ ভিসা তাকে দেশটিতে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ দেয়। দুগ্ধ খামারেই তার পরিচয় হয় এক ইংরেজ যুবকের সঙ্গে, যিনি তখন নিউজিল্যান্ডে বসবাস ও কাজ করছিলেন। পরে তারা বিয়ে করেন।
২০২৫ সালের মে মাসে দুজন একসঙ্গে নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব অর্জন করেন। তখনই ক্ল্যাট সিদ্ধান্ত নেন, মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়ার সময় হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমি কখনোই দেশটির প্রতি খুব বেশি দেশপ্রেমিক বা আবেগগতভাবে যুক্ত অনুভব করিনি। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র যে পথে এগিয়েছে, তা নিয়েও তিনি দীর্ঘদিন ধরে হতাশ ছিলেন।
জাতীয় রাজনীতি এবং বিদেশে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের ওপর করের বোঝা—দুই বিষয় মিলিয়ে নাগরিকত্ব ত্যাগ করাটাই তার কাছে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে।
নাগরিকত্ব ত্যাগকারীদের হিসাব
মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগকারীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সহজ নয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে জানিয়েছেন, তারা নাগরিকত্ব ত্যাগকারীদের সংখ্যা প্রকাশ করে না। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতি তিন মাসে একবার এ-সংক্রান্ত আইআরএস প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আইআরএসও জানিয়েছে, তাদের কাছে বার্ষিক নাগরিকত্ব ত্যাগকারীদের সমন্বিত কোনো তালিকা নেই।
তবে বিদেশে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান আমেরিকেন্স ওভারসিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আইআরএসের তালিকায় ৪,৮৮৯ জনের নাম রয়েছে। ২০২০ সালের পর এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা; ওই বছর সংখ্যা ছিল ৬,৭০৫।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এ বছর নাগরিকত্ব ত্যাগ বিষয়ে আগ্রহীদের কাছ থেকে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি অনুসন্ধান পাচ্ছে। তাদের ধারণা, গত বছরের তুলনায় এ বছর নাগরিকত্ব ত্যাগের হার ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে এবং আগামী কয়েক বছরও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন নাগরিককে পরামর্শ দিচ্ছে, যারা হয় নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন, নয়তো এ বিষয়ে তথ্য খুঁজছেন।
‘কোনো আফসোস নেই’
ক্ল্যাট জানান, নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরু করতে গিয়ে তিনি অবাক হন, কারণ সহায়তা পাওয়া ছিল বেশ কঠিন।
২০২৫ সালের আগস্টে তিনি সরকারকে ই-মেইল করে নিজের ইচ্ছার কথা জানান। কিন্তু অক্টোবর পর্যন্ত কোনো উত্তর পাননি। পরে প্রয়োজনীয় ফরম পূরণ করে জমা দেন।
আমেরিকেন্স ওভারসিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ড্যান ডারলাখার বলেন, দূতাবাস বা কনস্যুলেটে ই-মেইল পাঠিয়ে নাগরিকত্ব ত্যাগের ইচ্ছা জানানোই প্রথম ধাপ। এরপর ছয় থেকে নয় মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষে ক্ল্যাট অকল্যান্ডে মার্কিন কনস্যুলেটে সাক্ষাতের সময় পান। মার্চে গিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন।
তখনও ফি ছিল ২,৩৫০ ডলার (বর্তমানে ৪৫০ ডলার)। কনস্যুলেটে পৌঁছে ফি পরিশোধের পর তাকে নাগরিকত্ব ত্যাগের শপথ পাঠ করতে হয়।
তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর সময়ের সঙ্গে ঘটনাটি মিলে যাওয়ায় বিষয়টি তার কাছে আরো রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছিল।
নাগরিকত্ব ত্যাগের পর তিনি স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করেন।
“আমি আমার সিদ্ধান্তে খুবই খুশি। কোনো আফসোস নেই,” বলেন ক্ল্যাট। “বরং মাঝেমধ্যে উদযাপনই করি যে আমি আর তাদের অংশ নই।”
অর্থনৈতিক কারণও বড় ভূমিকা রাখে
তবে সবাই রাজনৈতিক কারণে নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন না। সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক চাপ।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক কর ও আইন পরামর্শ প্রতিষ্ঠান টাইগারম্যানের আইনজীবী জনাথন টি. টাইগারম্যান বলেন, বিদেশে বসবাস করলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আয়ের ওপর মার্কিন কর-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা অনেককে নাগরিকত্ব ত্যাগে উৎসাহিত করে।
বিশেষ করে তথাকথিত “অ্যাকসিডেন্টাল আমেরিকানস”—যারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বা মার্কিন বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, কিন্তু হয়তো কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস বা কাজ করেননি—তাদের জন্য এ বোঝা আরো বড়।
পরিচয়ের সংকট
ইতালিতে বসবাসরত দ্বৈত মার্কিন-ইতালীয় নাগরিক ক্যারোলিন চিরিকেল্লা নিজেকে “গর্বিত আমেরিকান” বলেই মনে করেন। তবু তিনিও মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
তার ভাষায়, “দ্বৈত নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য সংকট কাজ করে। ইতালিতে আপনি খুব বেশি আমেরিকান, আবার আমেরিকায় খুব বেশি ইতালীয়।”
তিনি মনে করেন, যে দেশে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চান, সেই দেশের একটিমাত্র পাসপোর্ট ধরে রাখলে পরিচয়ের এই দ্বন্দ্ব কিছুটা দূর হবে।
সহজ নয় নাগরিকত্ব ত্যাগ
মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে আগে অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকতে হবে। অন্যথায় আবেদন করা যায় না।
এ ছাড়া নাগরিকত্ব ত্যাগের আগে অন্তত পাঁচ বছরের কর-সংক্রান্ত নথি হালনাগাদ করতে হয়। দুই মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ থাকলে আরো জটিল নিয়ম ও কর প্রযোজ্য হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞ আইনজীবী বা হিসাববিদের সহায়তা নেওয়া প্রায় অপরিহার্য।
সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
নিউইয়র্কভিত্তিক অভিবাসন আইনজীবী ব্র্যাড বার্নস্টেইন সতর্ক করে বলেন, অনেকেই নাগরিকত্ব ত্যাগের পরিণতি পুরোপুরি ভেবে দেখেন না।
মার্কিন নাগরিকত্বের বড় সুবিধার মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সুবিধা এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবাধে বসবাস ও কাজ করার অধিকার।
তিনি বলেন, নাগরিকত্ব ত্যাগের পর আপনি আর মার্কিন নাগরিক নন। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে চাইলে—এমনকি ভ্রমণের জন্যও—ভিসা লাগবে, আর সেই ভিসা পাওয়া নিশ্চিত নয়।
তার মতে, কয়েক হাজার ডলার সাশ্রয়ের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কারণ এর ফলে কেউ স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করার অধিকার হারাতে পারেন। তবে অনেকের কাছে বিষয়টি কেবল অর্থ বা রাজনীতি নয়, বরং পরিচয়েরও প্রশ্ন।
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক হাওয়ার্ড ল্যাভিন বলেন, নাগরিকত্ব ত্যাগের মাধ্যমে মানুষ অনেক সময় নিজেদের নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চান।
সূত্র: সিএনএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


