বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো একসঙ্গে নানা ধরনের সংকটে পড়েছে। কোথাও পানির প্রবাহ কমছে, কোথাও বাড়ছে দূষণ, আবার কোথাও বাঁধ ও কৃত্রিম অবকাঠামোর কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন এবং হিমবাহ গলার সময়সূচিতে পরিবর্তনও নদীগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল ছিল তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে বিশ্বের নদীগুলোর জন্য অন্যতম শুষ্ক বছর। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম পানি প্রবাহের ঘটনা দেখা গেছে।
দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন ও লা প্লাতা নদী অববাহিকা থেকে শুরু করে এশিয়ার গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এবং আফ্রিকার কঙ্গো নদী—বিভিন্ন নদী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মুখে পড়েছে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন এবং কোথাও নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের কৃষি, পানীয় জল ও জীবিকার সঙ্গে এই দুই নদী সরাসরি যুক্ত। ফলে নদীর প্রবাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এই অঞ্চলের মানুষের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
আফ্রিকার কঙ্গো নদীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। বিশ্বের সবচেয়ে গভীর নদী হিসেবে পরিচিত এই নদীর পানিপ্রবাহ কয়েক দশক ধরে ধীরে ধীরে কমছে। বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন ও জলবায়ু ব্যবস্থার বিভিন্ন পরিবর্তন এর অন্যতম কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নদীগুলোর সংকটের জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী নয়। মানুষের নানা কর্মকাণ্ডও নদীর স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্বের বহু নদীকে বাঁধ, খাল, তীররক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। কোথাও এসব ব্যবস্থা নদীর জন্য প্রয়োজনীয় হলেও কোথাও অতিরিক্ত প্রকৌশল নদীর স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদী এর একটি উদাহরণ। নদীর নাব্যতা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে নদীটির গতিপথ ও মোহনায় বিভিন্ন প্রকৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব এখন নদীর আশপাশের মানুষের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে।
পানিবণ্টন নিয়েও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদীর পানি নিয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে নীল নদের পানি নিয়ে মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতে পানির উৎস ও বণ্টন নিয়ে বিরোধ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সব জায়গায় পরিস্থিতি একই রকম নয়। কিছু দেশে নদী পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও ফল দিতে শুরু করেছে। চীন ইয়াংজি নদীর পরিবেশ পুনরুদ্ধারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। জীববিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, নদীটির মাছের মোট জীবভর দ্বিগুণ হয়েছে এবং কিছু বিপন্ন প্রজাতির অবস্থারও উন্নতি হয়েছে।
দূষণও বিশ্বের নদীগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন নদীতে অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন ফেলার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই নদী পরিষ্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ার্সের কাছে রেকনকিস্তা নদীর পরিস্থিতি আরও গুরুতর। প্রায় ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী ১৮টি পৌর এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এবং এর অববাহিকায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। কয়েক দশক ধরে নদীটিতে অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন, শিল্পবর্জ্য ও আবর্জনা ফেলা হয়েছে।
রেকনকিস্তা নদীর তীরের কোস্তা এসপেরানজা এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে নদী ও আশপাশের খাল পরিষ্কারের কাজ করছেন। মারিয়া মঙ্গেস নামের এক নারী ১৯৯৮ সাল থেকে এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। পরে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় একটি শ্রমিক সমবায় গড়ে ওঠে, যারা নিয়মিত নদী ও খাল থেকে আবর্জনা সরিয়ে থাকে।
তবে শুধু আবর্জনা পরিষ্কার করলেই নদী পুরোপুরি সুস্থ হচ্ছে না। শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এখনো বড় সমস্যা। স্থানীয় পরিবেশ গবেষকদের মতে, নদীর পানিতে উচ্চমাত্রার ই-কোলাই এবং কম অক্সিজেনের উপস্থিতি জলজ প্রাণীর জন্য অনুপযোগী এবং মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
নদী রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পরিকল্পনা, কঠোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। কোথাও নদীকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের বদলে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিজেরাই নদী রক্ষায় এগিয়ে আসছে।
বিশ্বের নদীগুলোর এই সংকট বেড়েই চলছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, নদীর অতিরিক্ত প্রকৌশল, পানির জন্য রাজনৈতিক বিরোধ এবং নদী পুনরুদ্ধারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও তা যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের কাছে নদী শুধু পানি প্রবাহের একটি মাধ্যম নয়; মানুষের খাদ্য, কৃষি, জীবিকা, পরিবহন ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নদীর অস্তিত্ব সরাসরি যুক্ত। ফলে নদীগুলোকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি পানিপ্রবাহকে রক্ষা করা নয়, বরং নদীকে ঘিরে থাকা মানুষের ভবিষ্যৎ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

