জেন-জি বিপ্লব

তারুণ্যের অভ্যুত্থানে বদলে গেছে নেপাল, আশা ছড়াচ্ছে বিশ্বময়

আমার দেশ অনলাইন

তারুণ্যের অভ্যুত্থানে বদলে গেছে নেপাল, আশা ছড়াচ্ছে বিশ্বময়

গত সেপ্টেম্বরে ২৮ বছর বয়সী বাবলু গুপ্তা গোলাগুলির মধ্যেই নেপালের পার্লামেন্ট থেকে লাশ টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আর নিরাপত্তা বাহিনী তুরণ বিক্ষোভকারীদের ওপর চালাচ্ছিল দমনপীড়ন।

সরকার উৎখাতকারী সেই অভ্যুত্থানের সময় গুপ্তা ও তার সঙ্গীদের সেই প্রতিরোধ গত মাসেও ফুটে উঠেছিল। তবে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এক নতুন আবেগ-নতুন আশা। তিনি এবং নেপালের দক্ষিণাঞ্চলের একদল গ্রামবাসী হোলি উদযাপন করতে এবং পার্লামেন্টে তার প্রার্থিতাকে সমর্থন জানাতে একত্রিত হয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

মার্চ মাসের নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে, লোকজন বাবুল গুপ্তার মুখে আবির মাখিয়ে দিয়েছিল। ঘামে ভেজা তার মুখমণ্ডল প্রথমে সবুজ, তারপর বেগুনি, তারপর হলুদ, এবং শেষে লাল হয়ে উঠল। তিনি পলক ফেললেন। তার চোখের পাতা থেকে উজ্জ্বল গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়ল।

Babu

বাবলু গুপ্তা জয়ী হয়েছেন এবং জেন-জি বিক্ষোভে তার অনেক সহযোদ্ধাও জয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচনে যুব-চালিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) বিপুল বিজয় লাভ করেছে। নেপালের সদ্য নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের প্রায় ১০ শতাংশের বয়স ৩০ বা তার কম, যেখানে গত সংসদে এই হার ছিল ২ শতাংশেরও কম।

তরুণ নেপালিরা পরিবর্তন চেয়েছিল, কারণ তারা সবকিছু নিয়েই ছিল ত্যক্তবিরক্ত। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণীর বিলাসবহুল ভোগবিলাস এবং সরকারের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিষেধাজ্ঞায় ক্ষুব্ধ তরুণরা, কর্মহীন হওয়ার হতাশাজনক বাস্তবতা থেকে মুক্তি আদায় করে নিয়েছিল।

বাবলু বলেন, ‘আমরা মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। শুধু নেপালের আমরাই নই, সারা বিশ্বের অনেক জেন জি-ই এমন ছিল। আমরা জানতাম যে পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার।’

গত সেপ্টেম্বরে জেন-জি বিক্ষোভের অগ্রভাগে ছিলেন বাবুল গুপ্তা, যে বিক্ষোভে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একজন সত্তরোর্ধ্ব প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। এই অভ্যুত্থানে প্রাণহানির পাশাপাশি দেশজুড়ে হাজার হাজার ভবনে ব্যাপক অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। কিন্তু বিপ্লবী ধ্বংসের ছাই থেকে আশার চারাও জন্মায়। চীন ও ভারতের মাঝে অবস্থিত হিমালয়ের এই দেশটি আবারো তা প্রমাণ করেছে।

বিপ্লবের পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনে সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দায়িত্ব পালনকারী বাবুল গুপ্তা বলেন, ‘গত বছর যা ঘটেছে, তাতে আমাদের অনেক মানসিক আঘাত রয়েছে। আমি মনে করি, আমরা এই মানসিক আঘাতকে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর কিছুতে রূপান্তরিত করব।’

ক্ষোভের ঢেউ:

দুর্নীতি, দায়মুক্তি এবং ক্ষমতার ওপর একগুঁয়ে নিয়ন্ত্রণে কলঙ্কিত রাজনৈতিক পুরোনো রক্ষীবাহিনীর প্রতি বিশ্বব্যাপী তীব্র ঘৃণার ঢেউয়ের মধ্যে নেপালের জেন-জি প্রজন্ম জেগে ওঠে। ইন্দোনেশিয়া, পেরু এবং টোগোতেও বিক্ষোভের ঢেউ দেখা যায়। মরক্কো, কেনিয়া এবং ফিলিপাইনে যুবকরা সমাবেশ করেছে। বিশ্বজুড়ে তরুণরা ভিন্নমত সংগঠিত করার উপায় নিয়ে মিম ও পরামর্শ বিনিময় করেছে। নেপাল তার নেতাদের ক্ষমতাচ্যুত করার কয়েক সপ্তাহ পর, মাদাগাস্কারের তরুণরা তাদের প্রেসিডেন্টকে নির্বাসনে পাঠায়।

তবে, তারপরের মাসগলো হতাশাজনক। ২০২৪ সালে বিশ্বের প্রথম সফল জেন-জি বিদ্রোহের সাক্ষী বাংলাদেশে, ফেব্রুয়ারিতে ভোটাররা তরুণ বিকল্পের পরিবর্তে একটি প্রতিষ্ঠিত দলকে বেছে নিয়েছে। মাদাগাস্কারে, দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে গত মাসে সামরিক নেতা পুরো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বরখাস্ত করেছেন। অন্যান্য স্থানের বিক্ষোভগুলো মূলত স্তিমিত হয়ে গেছে।

নেপাল, যা ১৮ বছর আগে তার রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়েছে এবং এর দুই বছর আগে একটি মাওবাদী বিদ্রোহ দমন করেছে। নেপাল একটি ব্যতিক্রমী দেশ হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে এর ভোটাররা তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করছে।

Nepal 1

২৭ মার্চ, ৩৫ বছর বয়সী র‍্যাপার ও রাজধানী কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। বালেন্দ্র শাহ সম্ভবত রাজনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যুব আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিমূর্তি।

প্রতীকী তাৎপর্যে ভরপুর এক বিজয়ে, তিনি সেই সংসদীয় আসনটি দখল করেন যা দীর্ঘদিন ধরে চারবারের প্রধানমন্ত্রী এবং জেন জি প্রজন্মের কাছে ক্ষমতাচ্যুত কে.পি. শর্মা ওলির দখলে ছিল।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলি ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রেপ্তার হন। (আদালতের আদেশে তারা এখন মুক্তি পেয়েছেন।) ওলি এবং আরো দুজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। নেপালের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তরুণদের বিক্ষোভ সংগঠনে সহায়তাকারী সমাজকর্মী সুদান গুরুং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে লেখেন, ‘এখন দেশটি নতুন এক পথে যাত্রা করবে।’

তারপরও নেপালের রাজনৈতিক রূপান্তরের স্থায়িত্ব নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেমনটা ১৫ বছর আগে আরব বসন্তের অবসান দেখিয়ে দিয়েছিল, অভিজাত শ্রেণি সাধারণত নিজেদের অবস্থানে শক্তভাবে গেঁথে থাকে। তাদের গড়া ব্যবস্থাগুলো এতটাই লাভজনক যে তা ত্যাগ করা যায় না। ওলির গ্রেপ্তারের পর, তার দলের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে টায়ার জ্বালিয়েছে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

নেপাল এমন দেশগুলোর একটি উদাহরণ, যারা একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি — জনসংখ্যার দিক থেকে তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য, জলবায়ু পরিবর্তন, গণ অভিবাসন এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ভূ-রাজনৈতিক চাপ।

বালেন্দ্র শাহ, যিনি বালেন নামে পরিচিত-তিনি নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে জাতীয়তাবাদী বক্তব্য দিয়েছেন। ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে, তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে তাকে সমর্থনকারী জনতার ভিড় এবং তার ক্ষমতার প্রশংসায় ভরা গানের কথা ছিল এমন: ‘আমি বিপ্লবের ভূমিকম্পের মতো গর্জে উঠবো।’

নেপাল ওপেন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সঞ্জিব হুমগাইন বলেন, ‘আমাদের দেশের জন্য কেবল একজন ত্রাণকর্তাই আছেন, বালেন নামের এক দেবতা যিনি সাধারণ নিয়মকানুন মানতে বাধ্য নন- এই ধরনের মনোভাব থেকে সতর্ক থাকতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এমন একজন নেতা প্রয়োজন যিনি সুশাসন, সংসদীয় প্রক্রিয়া এবং দলগত কাজে পারদর্শী; এমন কোনো জনতুষ্টিবাদী নেতার প্রয়োজন নেই, যিনি বলছেন, ‘পুরনো অভিজাতদের পতন হোক’।’

তরুণ নেতৃত্ব:

৩০ বছর বয়সী রঞ্জু দর্শনা নির্বাচনের ১০ দিন আগে তার প্রথম সন্তানের জন্ম দেওয়ায় প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে তার অনুপস্থিতি কোনো সমস্যা তৈরি করেনি। তিনি নেপালের তরুণদের সমর্থিত দল আরএসপির প্রতিনিধিত্ব করেন এবং কাঠমান্ডুতে তার সংসদীয় আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।

তার এই বিজয় দলটির উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। এই বছরের সংসদীয় নির্বাচনের জন্য, দর্শনা আরএসপিতে যোগ দেন। দর্শনা বলেন, ‘রাষ্ট্রের হাতে নিহত তরুণদের রক্তের ওপর ভিত্তি করেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যে পরিবর্তনের জন্য তরুণরা প্রাণ দিয়েছেন, তা পুরণ করা আমাদের দায়িত্ব।’

২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত আরএসপির আবেদন সেই প্রতিশ্রুতির মধ্যেই নিহিত। এর প্রতিমূর্তি হলেন বালেন্দ্র শাহ, যিনি অভিবাসন, দুর্নীতি এবং অকার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করে র‍্যাপ করেন। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন রবি লমিছানে, একজন সাবেক সংবাদ উপস্থাপক যিনি নিজেকে একটি পরিচ্ছন্ন, কর্মঠ শ্রেণীর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তবে দুজনের কেউই কলঙ্কমুক্ত নন। লমিছানে আইনি ঝামেলায় জড়িয়ে আছেন এবং জেন-জি আন্দোলনের সময় জেল থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বালেন্দ্র মেয়র থাকাকালীন জোরপূর্বক বস্তি উচ্ছেদ এবং হকারদের গ্রেপ্তারে তদারকি করে সমালোচিত হয়েছিলেন।

এখন ক্ষমতায় আসার পর তাদের জবাবদিহিতা করার কথা বলা হচ্ছে। একসময় তারা অন্যের কাছে জবাদিহি চাইতেন।

বালেন্দ্র শাহের মন্ত্রিসভার এক-তৃতীয়াংশ মন্ত্রী নারী। ওলির ২২ জনের মন্ত্রিসভায় মাত্র দুজন নারী ছিলেন।

দর্শনা নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রীর গুণকীর্তন থেকে বিরত থাকেন। তিনি বলেন, ‘কোনো নেতাই দেবতা বা দানব নন। তারা কেবলই মানুষ।’

তিনি বলেন, ‘নেপালি মানসিকতা হলো, একজন নেতা এসে আমাদের উদ্ধার করবেন, এই আশায় অপেক্ষা করা। কিন্তু একাজ আমাদের নিজেদেরকেই করতে হবে।’

অভিবাসীর স্বপ্ন:

২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নেপালে জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই। নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান অর্থ আসে রেমিটেন্স থেকে।

নেপালের নতুন নেতৃত্ব ১২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করা এবং একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ইতোমধ্যেই, বিদেশে কর্মরতদের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার খরচ আরো সাশ্রয়ী করা হয়েছে। অতীতে শ্রম সংস্থাগুলো মাত্রাতিরিক্ত ফি নিত এবং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ ছিল।

কিন্তু এই বিপ্লব এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও দেশত্যাগ বন্ধ করতে পারেনি। ইউরোপে চলে যাওয়া ২২ বছর বয়সী সুজল পুন মাগার নামে এক নেপালি অভিবাসী বলেন, ‘আমি দুই বছর পর ফিরে এসে দেখতে চাই, আমার দেশ উন্নতি করেছে।’

এক নতুন নেপাল:

নেপাল বদলাচ্ছে। অথবা বলা ভালো, নেপাল বদলে গেছে। একজন মিলেনিয়াল র‍্যাপার একটি দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য শপথ নিচ্ছেন, এরকম ঘটনা সব সময় ঘটেনা।

প্রতিষ্ঠান-বিরোধী দর্শন বালেন্দ্রকে অনুপ্রাণিত করে, যদিও তিনি তার দলের সাহসী সংস্কারগুলো ব্যাখ্যা করার মতো কেউ নন। নির্বাচনের পর থেকে তিনি কোনো সংবাদ সম্মেলন করেননি। তবুও, বিশ্বের অন্যান্য অংশে যখন পুরোনো শক্তিগুলো জেন জিদের কোণঠাঁসা করার চেষ্টা করছে, তখন বালেন্দ্র শাহ পরিবর্তনের যে আশা তৈরি করেছেন, তা অব্যশই তাৎপর্যপূর্ণ।

Nepal 2

পরিবর্তন অপ্রত্যাশিত উপায়ে আসে। গত মাসে, ২৯ বছর বয়সী প্লাম্বার সুরেন্দ্র পান্ডে একটি ছেঁড়া স্যুট পরে তার স্ত্রী মায়া গুরুংকে (একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী) সঙ্গে নিয়ে পার্লামেন্টের কাছে প্রচারণায় গিয়েছিলেন। এই এলজিবিটিকিউ দম্পতি নতুন নেপালে সমতা এবং সকলের জন্য সমান মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলছিলেন।

সেুরন্দ্র বলেন, ‘আমি চাই মানুষ যেন বুঝতে পারে প্রত্যেকের কথা, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনা উচিত। গণতন্ত্রের অংশ হওয়ার অধিকার আমাদেরও আছে।’ তার মতে, ‘সারাবিশ্বেই রূপান্তর প্রয়োজন। আর নেপালে অবশেষে এটি শুরু হচ্ছে এবং এতে আমি খুব খুশি।’

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন