অভিযোগ নেই, বিচার নেই— তবু ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতনের শিকার গাজার চিকিৎসক আবু সাফিয়া

অভিযোগ নেই, বিচার নেই— তবু ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতনের শিকার গাজার চিকিৎসক আবু সাফিয়া
ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতনের শিকার গাজার চিকিৎসক আবু সাফিয়া। ছবি: রয়টার্স

ইসরাইলি কারাগারে আটক গাজার চিকিৎসক হুসাম আবু সাফিয়ার ওপর নির্যাতন এখনো চলছে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী। নতুন সাক্ষ্যে আবু সাফিয়া বলেছেন, কারারক্ষীরা তাকে মারধর করছেন, ঘুমাতে দিচ্ছেন না। আটকের পরিস্থিতি আইনজীবীকে জানালে তাকে হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এতে তার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে আবু সাফিয়াকে আটক করে ইসরাইলি বাহিনী। তখন হাসপাতালটি গাজায় চালু থাকা শেষ দিকের কয়েকটি চিকিৎসাকেন্দ্রের একটি ছিল। হাসপাতাল খালি করার ইসরাইলি নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তিনি।

গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধে শত শত চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে উপত্যকার প্রায় সব হাসপাতাল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আবু সাফিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে তার পরিবার ও অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। তাকে মুক্তি দেওয়ার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

জুলাইয়ে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন জানায়, আবু সাফিয়া ‘নিরবচ্ছিন্ন ও গুরুতর নির্যাতনের’ শিকার হচ্ছেন। গত মাসে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকও তার জীবন রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

নতুন সাক্ষ্যে নির্যাতনের বর্ণনা

বুধবার ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরাইল (পিএইচআরআই) এক বিবৃতিতে আবু সাফিয়ার নতুন সাক্ষ্যের কথা জানায়। তার আইনজীবী নাসের ওদেহ গত রোববার মধ্য ইসরাইলের নিজান কারাগারের রাকেফেত আটককেন্দ্রে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন।

আবু সাফিয়া আইনজীবীকে বলেন, কারারক্ষীরা তাকে নিয়মিত মারধর করছেন। রাতে তাকে ঘুমাতে দেওয়া হচ্ছে না। আটকের পরিস্থিতি আইনজীবীকে জানালে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

পিএইচআরআইয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, কারারক্ষীরা ঘুষি ও লাথি মেরে এবং লাঠি দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করেছেন। সংবেদনশীল স্থানেও তাকে পেটানো হয়েছে।

রাতে লাউডস্পিকারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে শব্দ করে ইচ্ছাকৃতভাবে তার ঘুম নষ্ট করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।

আগে থেকেই নির্যাতনের অভিযোগ

আবু সাফিয়ার পরিবার ও অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তিনি নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

তার আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাকেফেতের ভূগর্ভস্থ আটককেন্দ্রে তাকে একাকী রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিনই তাকে মারধর করা হচ্ছে।

জুলাইয়ে পিএইচআরআই জানায়, একপর্যায়ে আবু সাফিয়ার মাথা, চোখের চারপাশ, কান ও ঘাড়ে গুরুতর ও তাজা আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার চেহারা এতটাই বদলে গিয়েছিল যে আইনজীবীর তাকে চিনতে কষ্ট হয়েছিল।

জুনে ইসরাইলি আদালতে ভিডিও সংযোগে আবু সাফিয়াকে হাজির করার একটি ফুটেজ প্রকাশিত হয়। এতে তার মুখ ও পেটের অংশ আগের তুলনায় অনেক বেশি শুকনো দেখাচ্ছিল।

১০ আগস্ট তাকে রাকেফেত থেকে রামলা কারাগারের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।

পিএইচআরআই বলেছে, এই স্থানান্তর তার গুরুতর চিকিৎসার প্রয়োজনের ইঙ্গিত দেয়। সাধারণ কারাগারের ওয়ার্ডে সেই চিকিৎসা যথাযথভাবে দেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।

মুক্তির দাবিতে আইনি পদক্ষেপ

আবু সাফিয়ার চিকিৎসা নিয়ে আইনি পদক্ষেপও চালিয়ে যাচ্ছে পিএইচআরআই। সংগঠনটি একজন স্বাধীন চিকিৎসক দিয়ে তার শারীরিক পরীক্ষা করানোর দাবি জানিয়েছে।

৭ জুলাই ইসরাইলের কারা কর্তৃপক্ষের কাছে এ আবেদন করা হয়েছিল। তবে এখনো তা অনুমোদন করা হয়নি বলে জানিয়েছে পিএইচআরআই।

আবু সাফিয়া ওই সংগঠনের মাধ্যমে ইসরাইলের একটি প্রশাসনিক আদালতেও আবেদন করেছেন। ইসরাইলের কারা কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জবাব দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়েছে।

পিএইচআরআই বলেছে, এ বিষয়ে আর দেরি করার কোনো কারণ নেই।

অভিযোগ নেই, বিচারও হয়নি

আবু সাফিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। তার কোনো বিচারও হয়নি। ইসরাইলের ‘কমব্যাট্যান্ট আইন’-এর আওতায় তাকে আটক রাখা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ সময় বিচার ছাড়াই আটক রাখা যায়।

কামাল আদওয়ান হাসপাতালে অভিযান চালানোর পর ইসরাইলি বাহিনী তাকে আটক করে। পরে হাসপাতালটি ধ্বংস করে ইসরাইলি বাহিনী। হাসপাতাল খালি করার নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন আবু সাফিয়া।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই আইনকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করেছে।

সংগঠনটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের উপপরিচালক সারা হাশাশ আল-জাজিরাকে বলেন, এই আইনের আওতায় গাজা থেকে আসা এমন ব্যক্তিদের অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক রাখা যায়, যাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বা শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহ করা হয়। এ ক্ষেত্রে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আটক করা যায়। অভিযোগপত্রও দিতে হয় না।

আটক হওয়ার আগে গাজার বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিস্থিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে আবু সাফিয়া ছিলেন অন্যতম পরিচিত কণ্ঠ। ইসরাইলি ড্রোন হামলায় তার এক ছেলে নিহত হওয়ার পরও তিনি চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন।

পিএইচআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজার আরো অন্তত ১৩ জন ফিলিস্তিনি চিকিৎসককে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কোনো অভিযোগ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে।

বুধবারের বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, গাজা থেকে আটক ১৪ জন চিকিৎসককে মুক্তি দেওয়াই তাদের প্রধান দাবি। এর মধ্যে আবু সাফিয়াও রয়েছেন। তারা যেন পরিবারের কাছে ফিরতে এবং আবার চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হতে পারেন, সেটিই তাদের দাবি।

আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া

জুলাইয়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন আবু সাফিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার জন্য ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তাকে দ্রুত স্বাধীন চিকিৎসাসেবা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোও তার মুক্তি এবং ইসরাইলি হেফাজতে নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

সারা হাশাশ বলেন, আবু সাফিয়ার ওপর গুরুতর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, দীর্ঘ সময় একাকী রাখা, মারধর এবং অন্যান্য দুর্ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে অ্যামনেস্টি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

তিনি বলেন, আবু সাফিয়াসহ অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটক রাখা সব ফিলিস্তিনিকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়া উচিত।

ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ

জাতিসংঘের জুলাইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবু সাফিয়ার সঙ্গে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের আচরণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতনের যে বিস্তৃত চিত্র আগের প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে, তার ঘটনাও তার সঙ্গে মেলে।

তদন্ত কমিশনের মতে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার ব্যাপক এবং নিয়মতান্ত্রিক।

কমিশন ইসরাইলকে নির্বিচারে আটক ও নির্যাতনের নীতি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আটককেন্দ্রগুলোতে স্বাধীন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের অবাধ প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইসরাইলের অব্যাহত অবজ্ঞা এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার অভাবের কথা উল্লেখ করে সারা হাশাশ বলেন, আবু সাফিয়াসহ নির্বিচারে আটক সব ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিতে ইসরাইলের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো জরুরি।

পিএইচআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতনের কারণে অন্তত ১০৫ জন নিহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরাইলের কারাগারে ৯ হাজার ৪০০-এর বেশি বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯২ জন নারী এবং ৩৭০-এর বেশি শিশু।

ইসরাইলি হেফাজতে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত মারধর, অনাহারে রাখা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে। সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দীরা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, কারারক্ষী ও সেনাদের হাতে তারা অমানবিক আচরণ, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন