বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কারোপ

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কারোপ
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্কারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশের অস্থায়ী বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিনই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি এলো।

বিজ্ঞাপন

গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল রেজিস্টার’-এ প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মার্কিন বাজারে প্রবেশ করা প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ আমদানিকৃত পণ্যের ওপর এই নতুন শুল্ক কার্যকর হবে। তবে তেল ও গ্যাস, সার, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্য এবং আগেই জাতীয় নিরাপত্তার আওতায় শুল্ক থাকা খাতগুলোকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের দাবি, দেশটির বাণিজ্য আইনের ‘৩০১ ধারা’র আওতায় নেওয়া এই পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি বেশ মজবুত। অতীতেও এই ধারায় নেওয়া সিদ্ধান্ত আইনি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে গেছে।

কার্যকরের সময়সূচি

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন ১৫০ দিনের জন্য একটি অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্ক চালু করেছিল। শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে (ইডিটি) এই অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ শেষ হবে এবং ঠিক একই সময় থেকে নতুন শুল্কনীতি কার্যকর হবে।

তবে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী ২৮ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট (ইডিটি) পর্যন্ত পরিবহন বা ট্রানজিটে থাকা পণ্যগুলো নতুন এই শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে।

তিন ধাপে শুল্ক নির্ধারণ

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহারকে তিনটি মূল ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে।

১. ১০ শতাংশ শুল্ক

আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, ব্রিটেন, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো।

২. ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ শুল্ক

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ড। এদের বিদ্যমান ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ শুল্কের সমন্বয়ে নতুন হার নির্ধারিত হবে।

৩. ১২.৫ শতাংশ শুল্ক

চীনসহ বাকি ৩৮টি দেশ।

জোরপূর্বক শ্রম ও নীতিগত অবস্থান

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক শতাব্দী ধরে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছে। এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদেরও একই মানদণ্ড অনুসরণ করার সময় এসেছে। এই পদক্ষেপ মানবাধিকার রক্ষা, অন্যায্য বাণিজ্যিক চর্চা রোধ এবং শ্রমিকদের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে।

গ্রিয়ার আরো স্পষ্ট করেন, যেসব দেশ ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শুল্কের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে নতুন এই শুল্ক সেই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করবে না। কারণ এসব চুক্তিতে জোরপূর্বক শ্রমবিরোধী স্পষ্ট বিধান রয়েছে।

তবে এই নতুন নীতির ব্যাখ্যা নিয়ে বাণিজ্য বিশ্লেষক ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য দেখা গেছে। ওয়াশিংটনের আইন প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াইলি রেইন’-এর বাণিজ্য আইনজীবী টিম ব্রাইটবিলের মতে, নতুন শুল্ক মূলত বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তির নির্ধারিত শুল্ক কাঠামোর সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তা সদ্য মেয়াদ শেষ হওয়া ১০ শতাংশ শুল্কের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এটি কেবল আগের শুল্কের বিকল্প নয়। যুক্তরাষ্ট্রে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের প্রবেশ ঠেকাতে এটি একটি কঠোর বাণিজ্যিক কৌশল। কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলই বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে জোরপূর্বক শ্রম নির্মূলের পক্ষে। ট্রাম্প প্রশাসন প্রয়োজনে বাণিজ্যিক উপায় ব্যবহার করে এই লক্ষ্য অর্জন করবে।

শুল্কের আওতামুক্ত সুবিধা

যেসব খাত বা পণ্য এই নতুন শুল্কের বাইরে থাকবে—

তেল ও গ্যাস, সার, নির্দিষ্ট চিনিজাত পণ্য, পিগ আয়রন, পশু, বীজজাত পণ্য এবং বিশেষ কিছু রাসায়নিক পদার্থ।

গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা, যেগুলোর ওপর আগে থেকেই ‘২৩২ ধারা’র আওতায় জাতীয় নিরাপত্তাজনিত শুল্ক রয়েছে।

‘যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা’ (ইউএসএমসিএ) বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণকারী পণ্য, যা উত্তর আমেরিকার সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত মার্কিন উপাদান দিয়ে তৈরি।

৩০১ ধারার আওতায় ১ জুনের প্রস্তাবিত নীতি অনুসরণ করে যেসব দেশে জোরপূর্বক শ্রমবিরোধী পর্যাপ্ত আইন রয়েছে, যেমন—সাম্প্রতিক সময়ে আইনি সংস্কার করা ভারতে ১০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়েছে। আর যেসব দেশে এসব আইন বা প্রয়োগ দুর্বল, সেগুলোতে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন