সৌদি আরবের আলউলা অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ বছর আগের মানববসতির চিহ্ন থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত বিস্তৃত ইতিহাসের নানা নিদর্শন উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. লায়লা নেহমে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তার গবেষণা ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রাচীন আরব সভ্যতা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ, ভাষা, লিপি এবং মানুষের জীবনযাপনের নানা অজানা তথ্য।
ফরাসি ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের গবেষক হিসেবে ২০০২ সাল থেকে সৌদি আরবের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আলউলায় বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রকল্পে কাজ করছেন নেহমে। প্রাচীন আরব জনগোষ্ঠী নাবাতীয়দের সভ্যতা তার গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয়।
সিরিয়া ও জর্ডানের প্রাচীন নগরী পেত্রায় কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি সৌদি আরবের হেগরা প্রত্নস্থলে গবেষণা শুরু করেন। হেগরা মাদায়েন সালেহ নামেও পরিচিত। একসময় নাবাতীয় সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এই অঞ্চল। প্রাচীন স্থাপত্য, সমাধি, শিলালিপি ও বাণিজ্যপথের নিদর্শন এখানে ইতিহাসের সমৃদ্ধ উপাদান হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
নেহমের মতে, আলউলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর দীর্ঘকালব্যাপী মানব-ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। প্রায় ২ লাখ বছর আগের প্রস্তরযুগীয় মানুষের উপস্থিতি থেকে শুরু করে ১৯৮০-এর দশকে পুরোনো শহরে মানুষের বসবাস পর্যন্ত বিস্তৃত এই ইতিহাস অতীতের সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক কাঠামো বোঝার একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
শিলালিপিতে সংরক্ষিত সভ্যতার ইতিহাস
আলউলার বেলেপাথরের পাহাড় ও পাথুরে ভূখণ্ডে বিভিন্ন সময়ের ভাষা ও লিপিতে উৎকীর্ণ অসংখ্য শিলালিপি পাওয়া যায়। এসব নিদর্শনের পাশাপাশি রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী, মানুষের অবয়ব এবং উটের চিত্রসংবলিত শিলাচিত্র।
প্রাচীন গ্রিক ও আরামাইক ভাষা নিয়ে অধ্যয়ন করা নেহমে বিশেষভাবে দক্ষতা অর্জন করেছেন নাবাতীয় আরামাইক ভাষা ও লিপিতে। পাথর ও প্যাপিরাসে সংরক্ষিত প্রাচীন লেখার পাঠোদ্ধার এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি অতীতের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
হেগরার কয়েকটি বিশাল সমাধিতে খননকাজ চালিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বহু মানবকঙ্কাল উদ্ধার করেন। শুষ্ক আবহাওয়া ও কম আর্দ্রতার কারণে কিছু কঙ্কাল অস্বাভাবিক ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল। কোনো কোনো খুলিতে চুলের অংশ এবং মেরুদণ্ড বরাবর ত্বকের চিহ্নও পাওয়া যায়। এ ছাড়া কাপড় ও চামড়ার কাফনের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আবিষ্কার প্রাচীন মানুষের দাফনপ্রথা, ব্যবহৃত উপকরণ এবং জীবনযাত্রার ধরন সম্পর্কে গবেষণার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
রেশমের ক্ষুদ্র টুকরোয় প্রাচীন বাণিজ্যের যোগসূত্র
আলউলার প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে পাওয়া একটি ছোট্ট রঙিন বস্ত্রখণ্ড বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথম পর্যবেক্ষণে বিশেষজ্ঞদের ধারণা হয়েছিল, এটি বন্য রেশম দিয়ে তৈরি হতে পারে। পরে রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপাদান শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি সুতা রাঙাতে ব্যবহৃত রঞ্জক এবং প্রোটিন বিশ্লেষণের মাধ্যমে রেশম উৎপাদনকারী মথের প্রজাতি শনাক্ত করার কাজ করা হয়। এই ক্ষুদ্র বস্ত্রখণ্ডের গবেষণা থেকে আলউলায় প্রাচীন ধূপের বাণিজ্যপথ ও রেশমপথের সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিকভাবে ধূপ, সুগন্ধি উপাদান ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন কাফেলাপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে রেশমপথের বিস্তৃত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে পণ্য ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান সহজ করেছিল। আলউলার ভৌগোলিক অবস্থান এ ধরনের যোগাযোগের ইতিহাস অনুসন্ধানে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একটি ক্ষুদ্র প্রত্নবস্তুও যে বৃহত্তর বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূত্র দিতে পারে, এই আবিষ্কার তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় নথিবদ্ধকরণের গুরুত্ব
প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুধু মাটির নিচ থেকে পুরোনো বস্তু উদ্ধার করার কাজ নয়; বরং প্রতিটি স্তর, উপাদান ও নিদর্শনের অবস্থান যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। মাটি, পাথর, কাঁচা ইট ও অন্যান্য উপাদানের স্তর বিশ্লেষণ করে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অতীতের বিভিন্ন সময়কে আলাদা করার চেষ্টা করেন। খননের মাধ্যমে কোনো স্তর সরিয়ে ফেলার পর সেটি আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। তাই প্রতিটি ধাপের সুনির্দিষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ না করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
এ কারণে খনন শুরুর আগে প্রত্নস্থলের সীমানা নির্ধারণ, দৃশ্যমান স্থাপনা চিহ্নিত করা, মৃৎপাত্র সংগ্রহ, জরিপ এবং মানচিত্র তৈরি করা হয়। এসব প্রাথমিক কাজের ভিত্তিতেই পরবর্তী খননের স্থান ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। ২০১৯ সাল থেকে নেহমে প্রাচীন কাফেলাপথের সন্ধানে মরুভূমিতে অভিযান পরিচালনা করছেন। এসব অভিযানের মধ্যে হেগরা থেকে তাইমা পর্যন্ত উটের পিঠে যাত্রা করে প্রাচীন পথ অনুসন্ধানের উদ্যোগও রয়েছে। তার পরিচালিত দুটি অভিযানের ভিত্তিতে প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে; এর একটি প্রচারিত হয়েছে ফরাসি-জার্মান টেলিভিশন চ্যানেল আর্তেতে।
গবেষণার ফল বই ও প্রদর্শনীতেও
হেগরায় দীর্ঘদিনের গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা নিয়ে নেহমে লিখেছেন গাইড টু হেগরা: আর্কিওলজি ইন দ্য ল্যান্ড অব নাবাতিয়ানস অব অ্যারাবিয়া। বইটিতে নাবাতীয় সভ্যতার ভূমিতে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, আবিষ্কার ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া তিনি ‘আলউলা: ওয়ান্ডার অব অ্যারাবিয়া’ শীর্ষক প্রদর্শনী আয়োজন ও পরিকল্পনায় যৌথভাবে কাজ করেছেন। প্যারিস ও বেইজিংয়ে প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয়।
আলউলার প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ এখন শুধু পর্যটন আকর্ষণ নয়; প্রাচীন সমাজ, অর্থনীতি, ভাষা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ইতিহাস পুনর্গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নেহমের মতো গবেষকদের দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান দেখাচ্ছে, যথাযথ সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও পদ্ধতিগত নথিবদ্ধকরণের মাধ্যমে অতীতের বিচ্ছিন্ন নিদর্শন থেকেও মানবসভ্যতার বিস্তৃত ইতিহাস পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

