জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা (স্টেশন অফিসার) ইমন মিয়ার বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা ঘুস গ্রহণ, সরকারি সম্পদ ও বিদ্যুতের অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য এবং জ্বালানি খাতের বরাদ্দ আত্মসাৎসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ জুলাই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব অনিয়মের সংবাদ প্রকাশিত হলেও অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা ইতিমধ্যে অনিয়মের তদন্ত ও শাস্তিমূলক বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
চাকরির নামে সাড়ে ৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগপত্র সূত্রে জানা গেছে, ক্ষেতলাল উপজেলার বড়বস্তা গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন দাবি করেন, ২০২৫ সালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সহকারী বাবুর্চি পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন ইমন মিয়া। চাকরি দেওয়ার পর কিছুদিন যেতেই বিভিন্ন অজুহাতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তা ছাড়া তোফাজ্জলের এক মাসের বেতনের টাকাও অভিযুক্ত কর্মকর্তা নিজের পকেটে পুরেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন ভুক্তভোগী তোফাজ্জল।
তোফাজ্জল জানান, অভিযোগ দায়েরের পর স্থানীয়ভাবে চাপ প্রয়োগ করে তাকে ১ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হলেও বাকি টাকা ও চাকরি ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বকেয়া টাকা উদ্ধার, চাকরি পুনর্বহাল এবং অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।
ছামছুদ্দিন নামে এক ব্যক্তির স্বাক্ষরিত অপর এক অভিযোগে ইমন মিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি বিদ্যুৎ ও সম্পদের অননুমোদিত ব্যবহার, অবকাঠামো নির্মাণে অনিয়ম, গাছ বিক্রি এবং অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ দাবির কথা উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ফায়ার স্টেশনের ব্যারাকের বিদ্যুতের মিটার থেকে নিজের কোয়ার্টারে লাইন টেনে সরকারি খরচে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন এই কর্মকর্তা। এ ছাড়া স্টেশনের রান্নাঘর ও কোয়ার্টার সংস্কারের কথা বলে সরকারি স্থাপনার ক্ষতিসাধনপূর্বক উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) দপ্তর থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা বরাদ্দ নেন। উক্ত কাজের ঠিকাদার ছিলেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমানের ভাই জাহিদুল ইসলাম। এ ছাড়া সরকারি টিউবওয়েলের যন্ত্রাংশ বিক্রি এবং ২০১৬ সালের মার্চে ঝড়ে উপড়ে পড়া একটি সরকারি গাছ উদ্ধার করে স্টেশনে নিয়ে পরে তা ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে।
পুনরায় নিয়োগ-বাণিজ্য ও সরকারি খরচে নিজস্ব খামার তোফাজ্জলকে ছাঁটাই করার পর আমিরুল ইসলাম নামে অন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ৪ লাখ টাকা ঘুস নিয়ে পুনরায় একই পদে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণ অভিযানে অতিরিক্ত সময় ও দূরত্ব দেখিয়ে জ্বালানি খাতে প্রায় ১ লাখ টাকা অতিরিক্ত উত্তোলন করেন ওই কর্মকর্তা।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে যৌথভাবে পুকুরে মাছ চাষ এবং ফায়ার স্টেশনের চারতলার ছাদে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্রয়লার মুরগির খামার গড়ে তোলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর চালক ওয়াসিম, ফায়ার ফাইটার আব্দুল খালেক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবায়দুলকে দিয়ে সেই মুরগির ঘরটি ভেঙে ফেলা হয়। স্টেশনের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব অনিয়মের সতত্যা নিশ্চিত করেছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্টেশন অফিসার ইমন মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।’
রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক মঞ্জিল হক জানান, তিনি মাসিক রিপোর্ট ফাইলিংয়ের কাজে ক্ষেতলাল স্টেশনে গিয়েছিলেন, কোনো তদন্তের জন্য নয়।
বিষয়টি নিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, চাকরির জন্য ঘুস দেওয়া এবং নেওয়া—দুই পক্ষই সমান অপরাধী। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

