ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ

গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে তেল আবিব

গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে তেল আবিব

গাজায় অব্যাহত বোমা হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। প্রাণ হারাচ্ছে শত শত মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনাহারে মৃত্যু। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নিরীহ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরাইল। এমনটাই অভিযোগ করেছে ইসরাইলের দুই প্রভাবশালী মানবাধিকার সংস্থা।

বে’তসেলেম ও ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-ইসরাইল নামের দুই সংস্থা গত ২১ মাসের সংঘাতের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে সোমবার পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই সংস্থা দুটি কয়েক দশক ধরে ইসরাইলে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

তারা যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, এই অন্ধকার সময়ে সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরা এবং সঠিক নামে সম্বোধন করা গুরুত্বপূর্ণ। একসঙ্গেই অবিলম্বে অপরাধ বন্ধ করা জরুরি।

গাজায় যুদ্ধ ও গণহত্যা শুরুর পর থকে এই প্রথম ইসরাইলভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেশটির সরকারকে গাজায় ‘গণহত্যা’ চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। যদিও তেল আবিব বরাবরের মতো তা অস্বীকার করেছে বলে জানিয়েছেন ইসরাইল সরকারের মুখপাত্র ডেভিড মেনসার। তিনি বলেছেন, গাজার দুর্ভোগের জন্য দায়ী সেখানকার সন্ত্রাসী সংগঠন হামাস। আর তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর লক্ষ্য সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা, বেসামরিক নাগরিকেদের হত্যা করা নয়।

সোমবার জেরুসালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে বে’তসেলেমের নির্বাহী পরিচালক ইউলি নোভাক বলেছেন, তাদের সংস্থা এমন একটি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা তারা কখনো লেখার বিষয়ে কল্পনা করেনি।

৮৮ পৃষ্ঠার এই নথিতে বলা হয়, গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের নীতি, এর ভয়াবহ পরিণতি এবং এই হামলার লক্ষ্যবস্তু নিয়ে ইসরাইলের শীর্ষ রাজনীতিক ও সামরিক কমান্ডারদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গাজা উপত্যকায় ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি সমাজকে ধ্বংস করার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নিচ্ছে ইসরাইল।

এদিকে, ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরাইল তাদের ৬৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলেছে, তাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক আইনি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসরাইল গাজার স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকে এমনভাবে ধ্বংস করেছে, যা পরিকল্পনা ও নিয়মতান্ত্রিক।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার হাসপাতালগুলোতে আক্রমণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং স্থানান্তরে বাধা, স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের হত্যা ও আটকের মাধ্যমে সেখানকার স্বাস্থ্য এবং জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থাগুলো ইচ্ছাকৃত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে।

ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরাইলের নির্বাহী পরিচালক ডা. গাই শালেভ বলেছেন, গণহত্যার মুখে নীরবতা কোনো বিকল্প নয়। আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই, গণহত্যার মুখোমুখি হওয়া কেবল আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতেরও এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

সংগঠন দুটি ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে ইসরাইলের ওপর হামাসের হামলাকে ‘ভয়াবহ ও অপরাধমূলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। বলা হয়েছে, ওই হামলা ইসরাইলিদের মধ্যে ভয় ও সম্মিলিত ট্রমার জন্ম দিয়েছে।

হামাসের ওই আক্রমণের জবাবে ইসরাইল চরম পন্থা অবলম্বন করে ফিলিস্তিনিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। ইসরাইলের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সামরিক কর্তাব্যক্তিরা তাদের বক্তব্যে গাজায় হামলার জন্য ফিলিস্তিনিদের দায়ী করেছে।

বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং স্কলাররা গাজায় গণহত্যার জন্য ইসরাইলকে অভিযুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার আনা একটি মামলা পরীক্ষা করে ইসরাইলি বাহিনী গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে। তবে এ অভিযোগকে তীব্রভাবে অস্বীকার এবং মামলাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, পক্ষপাতদুষ্ট ও মিথ্যা দাবি বলে জানিয়েছে ইসরাইল।

এদিকে, গাজা উপত্যকাজুড়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে, জাতিসংঘ-অনুমোদিত বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইনটিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন- আইপিসি। ২৫ জুলাই পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে আইপিসি থেকে প্রাপ্ত নতুন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাজায় ব্যাপক অনাহার, অপুষ্টি ও বিভিন্ন রোগ থেকে ক্ষুধাজনিত মৃত্যুর হার বাড়ছে। তবে একে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হচ্ছে না। গাজায় খাদ্যসংকট এতটাই ভয়াবহ যে, প্রতি তিনজনের একজন ব্যক্তি কয়েকদিন ধরে অভুক্ত থাকছেন।

পিএইচআরআই জানায়, ইসরাইল যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তা হঠাৎ ঘটা কোনো বিষয় নয়। বরং ফিলিস্তিনিদের একটি গোষ্ঠী হিসেবে লক্ষ্য করে তাদের ধ্বংস করার পরিকল্পিত অংশ, যা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তি-সংক্রান্ত কনভেনশনের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে সংজ্ঞায়িত কমপক্ষে তিনটি কাজ পূরণ করে। আর এতে স্বাক্ষর করেছিল ইসরাইল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন