রাজনৈতিক অনুদানের অর্থে ঝুঁকিতে গণতন্ত্র, বিলিয়নিয়ারদের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

রাজনৈতিক অনুদানের অর্থে ঝুঁকিতে গণতন্ত্র, বিলিয়নিয়ারদের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

রিফর্ম ইউকেকে দুই ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়ারের দেওয়া মোট ৭২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল অনুদান ব্রিটিশ গণতন্ত্রে অতিধনী ব্যক্তিদের প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই বিপুল অর্থ রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন ও নির্বাচনী ব্যয়ের বর্তমান ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাগুলো সামনে এনেছে।

সম্প্রতি ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়ার বেন ডেলো ও ক্রিস্টোফার হারবর্ন রিফর্ম ইউকেকে প্রত্যেকে ৩৬ মিলিয়ন পাউন্ড করে অনুদান দিয়েছেন। অর্থাৎ মাত্র দুই ব্যক্তির কাছ থেকেই দলটি পেয়েছে মোট ৭২ মিলিয়ন পাউন্ড। এত বড় অঙ্কের অর্থ একটি রাজনৈতিক দলের ওপর ব্যক্তিগত সম্পদের প্রভাব কতটা হতে পারে, সেই প্রশ্নকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চলমান ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল বিল’-এর গুরুত্বও বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক অনুদানের কোনো কার্যকর সীমা না থাকলে বিপুল সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিরা নির্বাচনী রাজনীতিতে অন্য নাগরিকদের তুলনায় অস্বাভাবিক মাত্রার প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এমতাবস্থায় হাউস অব লর্ডসকে বিলটিতে সংশোধনী এনে রাজনৈতিক অনুদান ও দলীয় ব্যয়ের ওপর অর্থবহ সীমা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে।

বেন ডেলো ও ক্রিস্টোফার হারবর্নের রাজনৈতিক অনুদানের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে। রাইকর্ফট পর্যালোচনায় বিদেশি প্রভাব মোকাবিলায় এমন ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অনুদানের ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ পাউন্ড সীমার কথা বলা হয়েছিল, যারা অন্তত এক বছর যুক্তরাজ্যে বসবাস করেননি। গার্ডিয়ানের মতে, ডেলো আগে হংকংয়ে বসবাস করেছেন এবং হারবর্ন থাইল্যান্ডেও অবস্থান করেন। তবে তারা এই বিধানের আওতায় পড়েন কি না, তা স্পষ্ট নয়। রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজও তাদের চলাচল ও বসবাসের বিস্তারিত জানেন না বলে মন্তব্য করেছেন।

রিফর্ম ইউকের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। দলটির জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় কমেছে। একসময় জনমত জরিপে দলটি লেবার পার্টির চেয়ে এগিয়ে ছিল এবং স্থানীয় নির্বাচনে ১ হাজার ৪০০-র বেশি আসন জিতেছিল। পরে দলটির অর্থায়ন নিয়ে তদন্ত এবং নির্বাচনী আইন এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে প্রকাশিত কিছু ফুটেজের কারণে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একই সময়ে নাইজেল ফারাজের নেতিবাচক জনমতও বেড়েছে।

তবে এসব কারণে রিফর্ম ইউকের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাবকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টি ৩৪ শতাংশ ভোট পেয়েও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। ভোটের সামান্য পরিবর্তনও আসনসংখ্যায় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে ফারাজের নেতৃত্বে রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।

ফারাজের ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতি আগ্রহ রয়েছে। তিনি যুক্তরাজ্যকে বিশ্বের প্রধান ক্রিপ্টোকারেন্সি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্যাপক আর্থিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার নীতির সঙ্গে একটি মিল তৈরি করে। হারবর্নকে রিফর্ম ইউকের বড় সমর্থক এবং ডেলোকে ট্রাম্পের ক্ষমা পাওয়া ব্যক্তিদের একজন।

সমস্যা শুধু বিদেশি অর্থ বা বিদেশি প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনের সময়কার ব্যয়ের সীমা থাকলেও ধনী ব্যক্তিরা নির্বাচনের বহু বছর আগে থেকে জনমত জরিপ, বিজ্ঞাপন, তথ্য সংগ্রহ ও দলীয় কর্মীদের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে পারেন। তাই দলীয় ব্যয়ের ওপর শুধু নির্বাচনী সময়কেন্দ্রিক সীমা যথেষ্ট নয়; পুরো নির্বাচনী চক্রজুড়ে রাজনৈতিক দলের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক দলগুলোকে ধনী ব্যক্তিদের অর্থায়নের জন্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে ‘পেছনের দরজা’ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগও বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে সচেতন মহল । একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সদস্যদের নিয়মিত অনুদান যাতে নতুন সীমার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছে।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রভাব যদি মূলত সম্পদের পরিমাণের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সমতা নষ্ট হয়। দুই অতিধনী ব্যক্তি বিপুল অর্থ ব্যয় করে একটি রাজনৈতিক দলকে এমন প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেন—এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। তাই রাজনৈতিক অনুদান ও নির্বাচনী ব্যয়ে কঠোর সীমা আরোপ এবং অর্থের বিনিময়ে অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব ঠেকাতে দ্রুত সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন