গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে একাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমার বৈঠকে আলোচ্যসূচি ভিন্ন ভিন্ন ছিল। তবে একটি বার্তা ছিল অভিন্ন—ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যায়সংগত ও মর্যাদাপূর্ণ একটি চুক্তি চায়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য হোয়াইট হাউসকে আন্তরিকতা এবং স্থায়ীভাবে আগ্রাসন বন্ধ করার প্রকৃত সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে।
সংঘাতের মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ইরান দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে আমরা নিজেদের রক্ষায় পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সম্পর্কে মৌলিকভাবে ভুল ধারণার ভিত্তিতে এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন। মনে হচ্ছে, এখনো তাকে ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে—বলা হচ্ছে, মাতৃভূমি রক্ষায় আমাদের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত নয়। অথচ এর বিপরীত প্রমাণ রয়েছে। বরং ২০২৫ সাল থেকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চালানো আগ্রাসন থেকে আমাদের নির্ভীক সামরিক বাহিনী মূল্যবান শিক্ষা নিয়েছে।
স্পষ্ট করে বললে, ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন যে আন্তরিকতার কথা বলে, তার ওপর আমাদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। এর প্রমাণ সবার সামনে রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমরা যখন সক্রিয়ভাবে আলোচনায় যুক্ত ছিলাম, তখন তারা আমাদের ওপর বোমা হামলা চালায়। এ বছরের জুনেও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তৃতীয়বারের মতো আমাদের ওপর হামলা করা হয়। তাহলে আমরা আবার কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস করব?
ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর কোনো আগ্রহ হোয়াইট হাউস দেখায়নি। উল্টো তারা আরো সহিংসতার হুমকি দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এখন অগ্রগতি হবে বলে আশা করার কারণ খুব কম। সাম্প্রতিক সময়ে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি দেখিয়ে দিয়েছে, এই সংঘাত কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এর পরিণতি কত দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকির প্রমাণ। এত কিছুর পরও একজন পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে কূটনীতিকে সুযোগ দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা আমার দায়িত্ব—সাফল্যের আশা ক্ষীণ হলেও।
সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আমি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সাত দিনের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি। যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে উভয় পক্ষকে কী করতে হবে, তাতে তা তুলে ধরা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রস্তাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রকে এমন কিছু করতে হবে না, যা করতে তারা আগে সম্মত হয়নি। কাঠামোগত চুক্তিতে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট, একইভাবে স্পষ্ট এর পরিণতিও: ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে এবং সপ্তম দিনে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু হবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করবে।
এদিকে হোয়াইট হাউস সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রভাব স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আমার কথার ওপর বিশ্বাস রাখার প্রয়োজন নেই। বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি পছন্দের যুদ্ধের আট মাস পেরিয়ে গেছে। এমনকি মুডিসও বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসনের কারণে চলতি বছর মার্কিন ভোক্তাদের আনুমানিক ২৬৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, যা প্রতিটি পরিবারের জন্য প্রায় ২ হাজার ডলারের সমান।
এই ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকের জন্য দায়ী জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম। তবে এই হিসাবের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর আরো বড় ক্ষতির পরিমাণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি এবং বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম হারানোর ব্যয় যোগ করলে, মার্কিন স্বার্থের জন্য এই যুদ্ধ কতটা বিপর্যয়কর, তা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাস্তবতা হলো, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সামুদ্রিক যানবাহনের ওপর ইরানের প্রভাব বিস্তারের অতুলনীয় সুযোগ সব সময় থাকবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিকল্প নৌপথ নিয়ে যত প্রচারই থাকুক না কেন, এই জলপথের বিকল্প নেই—আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতি, উভয়ের জন্যই। সুখবর হলো, হরমুজ প্রণালির অভিভাবক হিসেবে ইরান তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে চায় এবং আইনসম্মতভাবে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারীদের নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার করে।
সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ রয়েছে। তবে তা বাস্তবায়িত হতে পারে কেবল তখনই, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন আন্তরিকভাবে মেনে নেবে যে সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের আর কোনো সমাধানের পথ নেই। প্রায় আট মাসের যুদ্ধের পর বিষয়টি এরই মধ্যে স্পষ্ট হওয়ার কথা। কারণ, ইরানে হামলা চালানোর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে যেসব লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল, তার কোনোটিই অর্জিত হয়নি।
আমরা আবারও একটি বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এ অবস্থায় আমাকে সতর্ক করতে হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি কিংবা এ অঞ্চলের অন্য কোথাও উত্তেজনা আরো বাড়লে বেসামরিক মানুষের জীবন, আঞ্চলিক সব দেশের কল্যাণ এবং বিশ্ব অর্থনীতি গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের এ কথাই বলে, ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম হবে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার কূটনীতির পরিবর্তে সামরিক পদক্ষেপ বেছে নেয়, তাহলে আমি সম্পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, এর ফল হবে আরো বড় কৌশলগত ব্যর্থতা। ইরান একটি প্রাচীন ও গর্বিত সভ্যতা; কোনো শক্তির কাছেই এই সভ্যতা মাথা নত করে না।
তবু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যে ন্যায়সংগত ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানোর আন্তরিক ইচ্ছার জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেলে ইরান কূটনীতিকে আরেকটি সুযোগ দিতে প্রস্তুত। এই যুদ্ধে জড়ানোর সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেছিলেন। এখন সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করলে তার পরিণতি হবে অসীমভাবে আরো বেদনাদায়ক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

