গাজার ভোটারদের প্রথম চাওয়া চাকরি ও নিরাপত্তা

গাজার ভোটারদের প্রথম চাওয়া চাকরি ও নিরাপত্তা
ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিনের আসন্ন আইনসভা নির্বাচন গাজার তরুণ আহমাদ মোহসেনের জন্য প্রথম জাতীয় ভোট। ২৪ বছর বয়সি এই তরুণের কাছে নির্বাচনের গুরুত্ব একটাই—নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন বেকারত্ব, নিরাপত্তা, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান করেন।

বিজ্ঞাপন

দেইর আল-বালাহর একটি দোকানে প্রিপেইড ইন্টারনেটের কার্ড বিক্রি করেন মোহসেন। তিন বছর আগে ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর আগে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। নার্সিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে পেশাগত লাইসেন্স নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল হাসপাতালে কাজ করবেন, স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করবেন অথবা বিশেষায়িত কোনো কোর্স করবেন।

কিন্তু যুদ্ধ তার সেই পরিকল্পনা বদলে দেয়।

যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাস দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন মোহসেন। হাসপাতালে তখন আহত ও নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক। পরে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় অন্য কাজ খুঁজতে বাধ্য হন তিনি।

মোহসেন বলেন, ‘আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিকও পাচ্ছিলাম না। তাই অন্তত সামান্য আয় হবে—এমন অন্য কাজ খুঁজতে শুরু করি।’

আগামী ২৮ নভেম্বর ফিলিস্তিনের আইনসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ২০০৬ সালের পর এটিই হবে প্রথম ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচন। মোহসেনের জন্যও এটি প্রথম জাতীয় ভোট।

এই নির্বাচনে তার প্রত্যাশা স্পষ্ট। তিনি চান, প্রার্থীরা তার প্রজন্মের বেকারত্ব, নিরাপত্তা, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সমস্যা নিয়ে কথা বলুন।

তিনি বলেন, ‘প্রথম চাওয়া হলো, যেন ভালো বেতনসহ একটি স্থায়ী চাকরি পাই। যাতে নিজের ও পরিবারের খরচ চালাতে পারি। দ্বিতীয় চাওয়া নিরাপত্তা।’

গাজায় বেকারত্বের হার প্রায় ৮০ শতাংশ। ইসরাইলের দীর্ঘদিনের অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে ভূখণ্ডটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

মোহসেনের পরিবারের গাজার সালাহ আল-দিন সড়কের পূর্বদিকে জমি রয়েছে। ওই এলাকায় ইসরাইলের প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় তিনি সেখানে যেতে পারেন না। তিনি আশা করেন, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইল শিগগির ওই এলাকা থেকে সরে যাবে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজায় পুনর্গঠন শুরু হবে।

তার কাছে মানুষের জীবনে পরিবর্তন না এলে নির্বাচন যথেষ্ট নয়।

মোহসেন বলেন, ‘একজন প্রার্থীকে মানুষের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করাতে হবে এবং মানুষের কণ্ঠে কথা বলতে হবে। অন্য কারো কণ্ঠে নয়। ২০ বছর ধরে যুদ্ধ ও ধ্বংসের কারণে যে তরুণেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের হয়ে কথা বলতে হবে। এর অবসান দরকার।’

২০০৬ সালের ভোটের স্মৃতি

৫৩ বছর বয়সি গাসসান মারওয়ানের কাছে নির্বাচনের স্মৃতি আরো পুরোনো। ২০০৬ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে হামাস জয়ী হয়েছিল।

মারওয়ান আগে স্বর্ণকারের কাজ করতেন। পরে একটি কারখানা গড়ে তোলেন। সেটিই ছিল তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।

২০০৬ সালে ভোট দেওয়ার সময় তার আশা ছিল, নির্বাচন মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। সন্তানদের জন্য একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎও চেয়েছিলেন তিনি।

নুসেইরাতের একটি স্কুলে ভোট দিয়েছিলেন মারওয়ান। স্বাধীন রাজনীতিক মুস্তাফা বারঘুতির নেতৃত্বাধীন একটি তালিকায় ভোট দিয়েছিলেন তিনি। তার স্মৃতিতে ওই নির্বাচন ছিল স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু।

মারওয়ান বলেন, ‘আমি অনেক স্বচ্ছতা ও সততা দেখেছি। মনে হয়েছিল, এটি একটি গণতান্ত্রিক উৎসব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত ২০ বছরে সেই অভিজ্ঞতা আর ফিরে আসেনি।’

দুই দশক পর তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুদ্ধের সময় তার বাড়ি ও কারখানা ধ্বংস হয়ে যায়। ৩০ বছরের বেশি সময়ের পরিশ্রমও এখন পরিবারকে সেই স্থিতিশীলতা দিতে পারছে না, যার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘বাড়ি ও আয়ের উৎস হারানোর পর আর কী চাইবেন? এখন শুধু পুনর্গঠন, শান্তি ও দেশে নিরাপত্তাই চান।’

মারওয়ান সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান সন্তানদের তাঁবুর মধ্যে বসবাস করতে দেখে। যে স্থিতিশীল বাড়ি সন্তানদের জন্য তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি আর নেই।

যুদ্ধ তাকে এমন কাজেও ফিরিয়ে এনেছে, যা দীর্ঘ কর্মজীবনের পর কখনো করার কথা ভাবেননি। দূর থেকে পানি সংগ্রহ করে বহন করতে হচ্ছে তাঁকে।

মারওয়ান বলেন, ‘এত বছর পর আমাকে দূর থেকে পানি বহন করতে হচ্ছে। আমি কি এভাবেই থাকব? আজ আমার বয়স ৫৩। আর ১০ বছর পর ৬০-এর ঘরে থাকব। তখন এই বোঝা বহন করতে পারব না।’

তার মতে, এই পরিস্থিতি মানুষের রাজনীতির প্রতি আগ্রহও কমিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘রাজনীতির প্রতি আমাদের আগ্রহ কমেছে। রাজনীতি আমাদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে নয়, বরং হতাশা ও ক্ষোভ জমতে জমতে এমন হয়েছে। মানুষ এখন কীভাবে টিকে থাকবে এবং প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করবে, তা নিয়েই ব্যস্ত।’

তবু চারপাশের ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে নির্বাচন সামনে আসায় মারওয়ানের মধ্যে আশা ও সংশয় দুটোই কাজ করছে।

তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো মনে হয়, নির্বাচন নিয়ে কথা বলাটাই প্রায় কৌতুক। কারণ নির্বাচন করার মতো স্পষ্ট কোনো পরিস্থিতি নেই।’

পুনর্গঠনই অগ্রাধিকার

অধিকৃত পশ্চিম তীর, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। কমিশনের হিসাবে, গাজায় প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি ভোট দেওয়ার যোগ্য।

কমিশনের গাজা অঞ্চলের পরিচালক জামিল আল-খালিদি বলেন, ভূখণ্ডজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও যুদ্ধের পর ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে নির্বাচন আয়োজন বড় ধরনের লজিস্টিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ইসরাইল গাজায় নির্বাচনী সামগ্রী প্রবেশে বাধা দিলে স্থানীয়ভাবে এসব সামগ্রী তৈরির বিকল্প পরিকল্পনাও করেছে কমিশন।

গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক ইয়াদ আল-কুরার মতে, যুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ শেষ করে দেয়নি। বরং রাজনীতির কাছে তাদের প্রত্যাশা বদলে দিয়েছে।

প্রায় তিন বছর ধরে বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংস ও জীবিকা হারানোর পর গাজার মানুষের রাজনৈতিক চাহিদা এখন ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কতটা স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে, তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে মনে করেন তিনি। শুধু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা রাজনৈতিক স্লোগান এখন আর যথেষ্ট নয়।

আল-কুরার মতে, মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে—এমন নেতৃত্বই এখন প্রয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি গাজার পুনর্গঠন, অবকাঠামো পুনরুদ্ধার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত সচল করা এবং মানুষকে আবার স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকায় ফেরার সুযোগ তৈরি করা।

তিনি বলেন, ‘গাজা পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে—এমন নেতৃত্বের প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। কারণ এই ভূখণ্ডকে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।’

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...