পুরো দুবছর ইসরাইলি আগ্রাসনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের সঙ্গে গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতির পর নতুন করে এ অঞ্চলের পুনর্নির্মাণের কাজ শুরুর পরিকল্পনা চলছে। এ লক্ষ্যে আমেরিকা গাজাকে দুটি অঞ্চলে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে ইসরাইলি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর অধীনে থাকবে ‘সবুজ অঞ্চল’ (গ্রিন জোন), যেখানে শিগগির পুনর্নির্মাণকাজ শুরু হবে। অপরদিকে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলকে ‘লাল অঞ্চল’ (রেড জোন) হিসেবে চিহ্নিত হবে। সেখানে শিগগির পুনর্নির্মাণকাজ শুরু হবে না।
শুক্রবার ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত বিশেষ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকার সামরিক বাহিনীর এ-সংক্রান্ত নথিপত্র গার্ডিয়ানের হাতে এসেছে। নথিপত্র অনুযায়ী গাজাকে আমেরিকা দুই ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমেরিকান সরকারের এক কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘এটি এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা। এর জন্য বেশ সময় লাগবে। সহজেই এটি হবে না।’
নথিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাহিনী ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে গাজায় কথিত ‘হলুদ সীমারেখার’ (ইয়েলো লাইন) পূর্বে অবস্থান নেবে। হলুদ সীমারেখার পূর্বের এ অঞ্চলটিই ‘সবুজ অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত হবে। নথিপত্র অনুসারে এ অঞ্চলেই পুনর্নির্মাণকাজ আগে শুরু হবে।
ইসরাইলি বাহিনীর দখলে থাকা এ অঞ্চলে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া এখানকার স্থাপনাগুলো পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলি সেনারা।
অপরদিকে হলুদ সীমারেখার পশ্চিমের অঞ্চলকে নথিতে ‘লাল অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের হাতে থাকা এ অঞ্চলেই বর্তমানে বেশিরভাগ গাজাবাসী বাস করছেন।
এর মধ্যে সোমবার গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার ওপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটির কথা রয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে ট্রাম্পের পরিকল্পনা এবং ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আমেরিকার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব আকারে পাঠানো হয়।
এদিকে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) অব্যাহত চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজায় হামলা চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, শনিবার উত্তর গাজার জাবালিয়া, গাজা শহর ও দক্ষিণের রাফায় ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। তবে এতে কেউ হতাহত হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।
শনিবার গাজার সরকারি মিডিয়া দপ্তর জানায়, ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ২৮২ বার চুক্তি ভেঙে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। এর মধ্যে ২৩ ফিলিস্তিনিকেও গাজা থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় তারা।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাদের হামলায় ২৬০ ফিলিস্তিনি নিহত ও ৬৩২ জন আহত হন। এ নিয়ে দুবছরের আগ্রাসন ও এক মাসের যুদ্ধবিরতির মধ্যে মোট ৬৯ হাজার ১৮৭ জন নিহত ও এক লাখ ৭০ হাজার ৭০৩ জন আহত হয়েছেন।
ইসরাইলি হামলার মধ্যেই তীব্র বৃষ্টি ও প্লাবনের মুখে পড়েছে গাজাবাসী। পুরো গাজায় বৃষ্টির জেরে সৃষ্ট প্লাবনে ভেসে গেছে আগ্রাসনের মুখে উদ্বাস্তু শরণার্থীদের তাঁবু।
শুক্রবার আলজাজিরাকে গাজা শহরের বাসিন্দা আবদুর রহমান আসালিয়া জানান, শরণার্থীদের সবকিছুই প্লাবনের পানিতে ভিজে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন তাঁবু দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে শীতের তীব্রতা থেকে অন্তত মানুষকে রক্ষা করা যায়।’
গাজার সরকারি মিডিয়া দপ্তর জানিয়েছে, শরণার্থীদের জন্য তৈরি ৯৩ শতাংশ তাঁবুই আর ব্যবহারের উপযোগী নেই। আবহাওয়াগত কারণ ও ইসরাইলি হামলায় মোট এক লাখ ৩৫ হাজার তাঁবুর মধ্যে এক লাখ ২৫ হাজারই নষ্ট হয়ে গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

