মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে হামলা ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের দাম ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারে পৌঁছেছে। গত ১৮ মে’র পর এই প্রথম তেলের দাম ১১২ ডলার ছাড়াল।
ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথি আন্দোলন বুধবার সৌদি আরবের একাধিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। দাম্মামের একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলায় দুজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সৌদি আরবের একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বুধবার উত্তর উপসাগরে ‘অবৈধ’ তেল স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত চারটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। এতে জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরো তিনটি জাহাজ মাইনের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়েছে বলে দাবি করেছে বাহিনীটি। যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে আইআরজিসি বলেছে, উসকানি অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে আরো ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে কয়েকটি কূটনৈতিক মিশন থেকে কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কয়েকটি মিশন থেকেও কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। একই সময়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো ধাহরানে তাদের সদর দপ্তরের কর্মীদের সরিয়ে নিয়ে দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রায় আট মাস আগে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যকর অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছিল। তখন আশঙ্কা করা হয়েছিল, এটি ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকটে রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সে সময় বাজার বিশ্লেষকেরা দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
সংঘাত চলাকালে এপ্রিলে তেলের দাম কমে যায়। মে মাসের শেষ দিকে তা আবার ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে এবং জুলাইয়ের শুরুতে যুদ্ধবিরতির আশায় ব্যারেলপ্রতি ৭১ ডলারে পৌঁছায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ভেঙে পড়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর তেলের দাম আবার বাড়তে থাকে।
তবে জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানির পরিমাণ এখন যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রা ছাড়িয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো স্থলপথের পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর ও ওমান উপসাগরে তেল পরিবহনের পরিমাণ বৃদ্ধি।
বিশ্ববাজারে শেয়ারদরেও পতন
তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারের প্রধান শেয়ার সূচকগুলোতে পতন দেখা গেছে। মূল্যস্ফীতি ও ঋণ গ্রহণের ব্যয় বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় ইউরোপের স্টক্স ইউরোপ ৬০০ এর সূচক ১ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ এর সূচক কমেছে ০.৭ শতাংশ।
এশিয়ার বাজারে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ২.৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি ৩.৫ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ৩ শতাংশ কমেছে।
এদিকে, জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে চলতি বছর লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা জানিয়েছে মার্কিন বিমান সংস্থা আমেরিকান এয়ারলাইনস। বৃহস্পতিবার বাজার খোলার আগে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। ‘জ্বালানির ব্যয়ে ঐতিহাসিক চাপের’ কথা উল্লেখ করে চলতি বছর মুনাফা অর্জনের আগের পূর্বাভাসও প্রত্যাহার করেছে সংস্থাটি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


