ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিতে দুর্বল যুক্তরাষ্ট্র

তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে ‘খোঁড়া দৈত্য’ হিসেবে দেখছে বেইজিং

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে ‘খোঁড়া দৈত্য’ হিসেবে দেখছে বেইজিং

ইরানে দীর্ঘায়িত যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয় হওয়ায় ওয়াশিংটনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে হিসাব কষছে চীন। বেইজিংয়ের সামরিক বিশ্লেষক ও জাতীয়তাবাদী মহলে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে এমন ধারণা যে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার এতটাই ক্ষয় হয়েছে যে তাইওয়ানকে রক্ষায় তাদের কার্যকর সামরিক প্রতিরোধ দুর্বল হতে পারে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ও কংগ্রেস সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তার দূরপাল্লার স্টেলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করে ফেলেছে। পাশাপাশি, দেশটি বছরে যত টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র কেনে, তার প্রায় ১০ গুণ ইতোমধ্যে নিক্ষেপ করেছে। এতে চীনা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় দুর্বলতা শুধু অস্ত্র খরচ নয়, বরং দ্রুত উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা যা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে তাদের কৌশলগত শক্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

বিজ্ঞাপন

চীনের অবসরপ্রাপ্ত পিপলস লিবারেশন আর্মি কর্নেল ইউয়ে গ্যাংয়ের মতে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্যের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে এবং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধক্ষমতা প্রদর্শনের সামর্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। চীনা কট্টরপন্থী মহলে এই যুক্তিও উঠে এসেছে যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত সাফল্য না পায়, তবে চীনের মতো সমমানের প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে তাইওয়ান রক্ষায় আরও বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে।

এই প্রেক্ষাপট আগামী সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে ট্রাম্পের কূটনৈতিক অবস্থানকেও দুর্বল করতে পারে বলে মনে করছে বেইজিং। ট্রাম্প যেখানে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চীনের কাছ থেকে সয়াবিন ও বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি চাইবেন, সেখানে চীন চাইছে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা এবং বিশেষ করে তাইওয়ান প্রশ্নে মার্কিন সমর্থন কমানো।

শি জিনপিং ইতোমধ্যে তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রকে অস্ত্র বিক্রয়ে সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছেন। জানা গেছে, বেইজিংকে অস্বস্তিতে না ফেলতে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য নতুন অস্ত্র প্যাকেজ ঘোষণাও বিলম্বিত করেছে।

চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সরাসরি উল্লাস না দেখালেও বিভিন্ন ভাষ্য ও সম্পাদকীয়তে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পদকে অতিরিক্ত চাপে ফেলেছে। কমিউনিস্ট পার্টি-নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমস যুক্তরাষ্ট্রকে ‘খোঁড়া দৈত্য’ বলে উল্লেখ করে বলেছে, বিশ্বজুড়ে সামরিক শক্তি ছড়িয়ে রাখতে না পারলে তার প্রভাবশালী অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এই বিশ্লেষণ প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, শক্তির মাধ্যমে চীনকে নিরুৎসাহিত করাই এখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর একটি। ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারোও বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সম্পদ ব্যয় হলেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে ঠেকানোর সক্ষমতায় বাস্তব কোনো ক্ষতি হয়নি।

বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, চীনের সামরিক বাহিনীরও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে বড় যুদ্ধে অপ্রশিক্ষিত পিপলস লিবারেশন আর্মি অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান এবং নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আকাশ নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ অভিযান এবং উচ্চপ্রযুক্তি সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে এখনও তার সামরিক শক্তির কার্যকারিতা দেখিয়েছে।

তবু এই যুদ্ধ এশিয়ায় মার্কিন মিত্রদের মনে নতুন প্রশ্ন তুলছে সংকটের সময় ওয়াশিংটন কতটা নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চীন সরাসরি যুদ্ধের পথে না গিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ান প্রণালিতে আরও আক্রমণাত্মক ‘গ্রে-জোন’ কৌশল নিতে পারে।

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন