মধ্যপ্রাচ্যে কম খরচে ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে কম খরচে ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) একটি ছোট গুদামে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছেন শ্রমিকেরা। তাদের কাজ—থ্রিডি প্রিন্টেড বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জোড়া দিয়ে 'ইন্টারসেপ্টর' তৈরি করা, যা ঘণ্টায় ২০০ মাইল গতিতে উড়ে এসে আকাশে ধ্বংস করতে পারে ইরানি ড্রোন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাভিত্তিক স্টার্টআপ কোম্পানি ‘পাওয়ারআস’ কম খরচে ড্রোন ধ্বংসকারী এই অস্ত্র তৈরির জন্য গত মাসে আরব আমিরাতে এই কারখানা চালু করেছে। বিশ্বজুড়ে অস্ত্র সরবরাহের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে এটি তাদের প্রথম প্রবেশ। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী কারখানাগুলো বর্তমানে মাসে প্রায় ৩ হাজার ড্রোন ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বজুড়ে উৎপাদন বাড়িয়ে মাসে ১৫ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। তবে আমিরাতে তাদের গ্রাহক ও চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ্যে আনেনি কোম্পানিটি।

বিজ্ঞাপন

প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর

প্রতিরক্ষা শিল্প সাধারণত ধীরগতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উচ্চ খরচের জন্য পরিচিত। কিন্তু মিত্রদেশগুলোর জরুরি চাহিদা মেটাতে সেই ধারা বদলাচ্ছে পাওয়ারআস। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কারখানা তৈরি করে অস্ত্র রপ্তানি করার পরিবর্তে তারা যে অঞ্চলে প্রয়োজন, সেখানকার স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের সঙ্গেই অংশীদারত্ব তৈরি করছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমিরাতের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি হামলা চালায় ইরান। যুদ্ধে এ পর্যন্ত আমিরাতের বিভিন্ন লক্ষ্যে ৫০০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০টির বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত ও শত শত মানুষ আহত হয়েছেন, বন্ধ হয়েছে একটি তেল শোধনাগার এবং ধ্বংস হয়েছে অ্যামাজনের দুটি ডাটা সেন্টার। মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে আসায় এখন বিকল্প ও দ্রুত সরবরাহের ইন্টারসেপ্টরের চাহিদা সেখানে তীব্র।

লোগো খেলনার মতো সহজে জোড়া দেওয়া প্রযুক্তি

ইন্টারসেপ্টর হলো ছোট আকারের এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই আকাশে ড্রোন বা হুমকিকে ধ্বংস করে। পাওয়ারআস ‘গার্ডিয়ান’ নামের যে ইন্টারসেপ্টর তৈরি করেছে, তার প্রতিটির খরচ মাত্র ৫ হাজার ডলার (প্রায় ৬ লাখ টাকা)। ইউক্রেনে রাশিয়ার 'শাহেদ' ড্রোনের বিরুদ্ধে কার্যকর হওয়া এক নকশার ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি।

এই গার্ডিয়ান ইন্টারসেপ্টরগুলো তৈরি করা বেশ সহজ, সাধারণ 'লোগো' খেলনার মতো যন্ত্রাংশগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি আটকে দেওয়া যায়। এতে সহজে বাজারে পাওয়া যায় এমন মাইক্রোচিপ ও জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি লকহিদ মার্টিনের প্যাক-৩-এর মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে না পারলেও, ইরানের বহুল ব্যবহৃত শাহেদ ড্রোন ধ্বংসে দারুণ কার্যকর।

যৌথ উৎপাদন ও বিশ্ববাজার

পাওয়ারআসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল সিনেনস্কি জানান, আমিরাতের কারখানায় মূলত ফিলিপাইন ও চীনের শ্রমিকেরা দিনে প্রায় ৩০টি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছেন, যা শিগগিরই ১০০-তে উন্নীত করা হবে।

কোম্পানিটি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো সুরক্ষায় ২২ মিলিয়ন ডলারের একটি বাণিজ্যিক চুক্তি সই করেছে। এছাড়া ভারতের মুম্বাইয়ের কাছে একটি প্রতিরক্ষা কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়েও তারা ইন্টারসেপ্টর তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

এমনকি বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘লকহিদ মার্টিন’ ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে মিলে কম খরচে ইন্টারসেপ্টর তৈরির পরিকল্পনা করছে। তবে তাদের ২০ লাখ ডলার মূল্যের সেই মডেলটির পরীক্ষা ২০২৮ সালের আগে সম্ভব নয়।

অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘রেথিয়ন’ আমিরাতে তাদের ‘কয়োটি’ ইন্টারসেপ্টর তৈরির ঘোষণা দিয়েছে, যার প্রতিটির আনুমানিক খরচ ১ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ ডলার। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ ‘নেরোস’ ৫ হাজার ডলারে ‘ব্যান্ডিট’ নামে আরেকটি ইন্টারসেপ্টর ড্রোন বানাচ্ছে।

ব্যবসার পেছনের ট্রাম্প সংযোগ

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই 'পাওয়ারআস' শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত গলফ কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ওরিয়াস গ্রিনওয়ে হোল্ডিংস’-এর সঙ্গে একীভূত হয়। এই চুক্তির মধ্যস্থতা করে 'ডোমিনারি সিকিউরিটিজ' নামে একটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, যার অংশীদার ও উপদেষ্টা বোর্ডে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই বড় ছেলে—ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প।

এছাড়া কোম্পানিটির উপদেষ্টা বোর্ডে যোগ দিয়েছেন সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিথ কেলগ। গত জুনে ট্রাম্প জুনিয়রের উপদেষ্টা থাকা ‘আনইউজুয়াল মেশিনস’ নামে একটি ড্রোন যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পাওয়ারআসে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। চলতি মাসে মার্কিন বিমান বাহিনীর কাছে ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের জন্য ৯০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মূল্যের একটি চুক্তিও সই করেছে তারা।

যেভাবে শুরু হয়েছিল পাওয়ারআস

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালালে পাওয়ারআসের বীজ বপন করা হয়। চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান 'উইশিল্ড'-এর মালিক মাইকেল সিনেনস্কি ও তার বন্ধু রোমান ভিনফেল্ড ইউক্রেনে গিয়ে ড্রোন যুদ্ধের তীব্রতা চাক্ষুস করেন এবং তাদের নিজেদের মানবিক সহায়তার গুদামটিও ধ্বংস হয়ে যায়।

পরবর্তীতে সেখানে মার্কিন সেনা স্পেশাল অপারেশনের সাবেক সদস্য ব্রেট ভেলিকভিচ, অ্যান্ড্রু ফক্স এবং জিব মারমের সঙ্গে পরিচয় হয়। পাঁচজন মিলে গঠন করেন পাওয়ারআস। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তি লাইসেন্স করে এবং 'ট্যান্ডেম ডিফেন্স' ও 'কাইজেন অ্যারোস্পেস'-এর মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য নর্থ ক্যারোলিনা ও ক্যালিফোর্নিয়ার কারখানায় কাজ শুরু করেন।

সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম খরচের গার্ডিয়ান ইন্টারসেপ্টর মূল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সম্পূরক হতে পারে, তবে বিকল্প নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো স্টেসি পেটিজন বলেন, ইরান হয়তো দ্রুতগতির জেটচালিত 'গেরান-৩' ড্রোনসহ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বড় করছে। রাশিয়া ইউক্রেনে যেভাবে একযোগে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, ইরানও সেদিকে যেতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইআইএসএস) গবেষণা সহযোগী অ্যালবার্ট ভিডাল মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো লাখ লাখ ডলারের প্যাক-৩ ব্যবহার করে মাত্র ৪০ হাজার ডলারের শাহেদ ড্রোন ধ্বংস করার অর্থনৈতিক ঝুঁকি আর নেবে না। তাদের লক্ষ্য এখন যেকোনো উপায়ে নিজস্ব প্রযুক্তি গড়ে তোলা ও স্থানীয়ভাবে কম খরচে উৎপাদন করা।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন