যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই ধনী দেশ, কার জন্য কতটা সমৃদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই ধনী দেশ, কার জন্য কতটা সমৃদ্ধ

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, উচ্চশিক্ষা, আর্থিক বাজার, উদ্ভাবন, কৃষি, শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশটির প্রভাব ব্যাপক। বিশ্বের বৃহত্তম বহুজাতিক কোম্পানি, প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয়, শীর্ষস্থানীয় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোও এই দেশে অবস্থিত। অথচ নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিসকো কিংবা অন্য কোনো বড় শহরের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে গৃহহীন মানুষের মুখোমুখি হওয়া, প্রকাশ্যে মাদক ব্যবহার করতে দেখা এবং আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ে মানুষের সংগ্রামের খবর পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রচলিত ছবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, অন্যদিকে গৃহহীনতা ও দারিদ্র্য; একদিকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ঋণের পাহাড়; একদিকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে বৈশ্বিক বক্তব্য, অন্যদিকে সামরিক হস্তক্ষেপ ও অস্ত্র রপ্তানি নিয়ে বিতর্ক। এই বৈপরীত্যের সামনে প্রশ্ন ওঠে—যুক্তরাষ্ট্রকে কি সত্যিই ধনী দেশ বলা যায়? নাকি দেশটির সম্পদের বিপুলতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের বাস্তবতার মধ্যে এমন ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা ধনী হওয়ার প্রচলিত ধারণাকেই নতুন করে পরীক্ষা করতে বাধ্য করে? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের বদলে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান, সামাজিক বাস্তবতা, রাষ্ট্রীয় ব্যয়, সম্পদ বণ্টন এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকার তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ছিল প্রায় ৩০.৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার। নামমাত্র জিডিপির হিসাবে দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। এই বিপুল উৎপাদন ও আয় দেশটির শিল্প, প্রযুক্তি, সেবা, আর্থিক খাত, ভোক্তা বাজার এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ব্যাপকতা নির্দেশ করে।

কিন্তু জিডিপি একটি দেশের নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য পরিমাপ করে। এটি বলে না যে দেশের সম্পদ কার হাতে জমা হয়েছে, একজন সাধারণ নাগরিকের আবাসন বা চিকিৎসার সামর্থ্য কতটুকু, কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে কি না।

ধরা যাক, একটি দেশের মোট আয় অনেক বেশি; কিন্তু সেই আয়ের বড় অংশ যদি অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, আর বিপুলসংখ্যক মানুষ বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপে থাকে, তাহলে দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতি ধনী হলেও তার সামাজিক সমৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক। অর্থনৈতিক আকার এবং মানুষের জীবনমান—দুটি সম্পর্কিত হলেও এক জিনিস নয়।

যে দেশে গৃহহীন মানুষ চোখে পড়ে

যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তার বৈপরীত্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ গৃহহীনতা। দেশটির আবাসন ও নগর উন্নয়নবিষয়ক বিভাগ—হাউজিং অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট (এইচইউডি)—এর ২০২৫ সালের বার্ষিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক রাতের হিসাবেই যুক্তরাষ্ট্রে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫২ জন মানুষ গৃহহীন ছিলেন। তাদের মধ্যে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৩২০ জন আশ্রয়কেন্দ্রবিহীন অবস্থায়, অর্থাৎ রাস্তায় বা অনুরূপ স্থানে ছিলেন। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোট গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ২৭ শতাংশ বেশি ছিল। তবে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোট সংখ্যা ৩ শতাংশ কমেছিল।

এই পরিসংখ্যান দেখায়, গৃহহীনতা যুক্তরাষ্ট্রে বিচ্ছিন্ন কোনো নগর সমস্যা নয়; এটি একটি বড় জাতীয় সামাজিক সংকট। একই সঙ্গে পরিসংখ্যানটির সীমাবদ্ধতাও মনে রাখতে হবে। এটি নির্দিষ্ট একটি রাতে সংগৃহীত হিসাব, সারা বছরের মোট গৃহহীন মানুষের সংখ্যা নয়। সাময়িকভাবে আত্মীয়স্বজনের বাসায় থাকা, অনিরাপদ বাসস্থানে থাকা কিংবা গণনায় বাদ পড়ে যাওয়া মানুষের সব অভিজ্ঞতা এতে ধরা পড়ে না।

গৃহহীনতার পেছনে আবাসনের উচ্চমূল্য, ভাড়া ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান, সাশ্রয়ী বাসস্থানের ঘাটতি, পারিবারিক সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও মাদকাসক্তির চিকিৎসায় প্রবেশাধিকারের সমস্যা—বিভিন্ন কারণ কাজ করতে পারে। সব গৃহহীন মানুষ মাদকাসক্ত, কিংবা মাদকাসক্তির কারণেই সবাই গৃহহীন হয়েছেন—এমন ধারণা তথ্যসম্মত নয়।

তবু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির একটি দেশে কয়েক লাখ মানুষের স্থায়ী আশ্রয় না থাকা রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তৈরি করে। অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নাগরিকদের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা না গেলে সম্পদের সামাজিক ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক ওঠা স্বাভাবিক।

মাদকের সংকট: শুধু রাস্তার দৃশ্য নয়

যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর কিছু এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক ব্যবহার, নেশাগ্রস্ত মানুষের অসহায় অবস্থা এবং মাদকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি দৃশ্যমান। তবে এসব দৃশ্য দেখে গোটা দেশ কিংবা সব নগরীকে একইভাবে বর্ণনা করা ঠিক হবে না। শহর, পাড়া, সামাজিক শ্রেণি এবং সময়ভেদে পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র—সিডিসি—২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে জানায়, ২০২৪ সালে দেশটিতে মাদক অতিমাত্রায় গ্রহণের কারণে আনুমানিক ৮০ হাজার ৩৯১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১ লাখ ১০ হাজার ৩৭। অর্থাৎ এক বছরে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২৬.৯ শতাংশ কমেছিল। সংখ্যাটি তখন প্রাথমিক অনুমান ছিল, পরবর্তী সময়ে তা সংশোধিত হতে পারে।

মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু বছরে প্রায় ৮০ হাজার মাদকজনিত মৃত্যু কোনো ছোট সমস্যা নয়। ফেন্টানিলসহ শক্তিশালী সিনথেটিক ওপিওয়েড, মাদক সরবরাহের অবৈধ বাজার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এই সংকটের বিভিন্ন মাত্রা।

এখানে মূল প্রশ্ন শুধু মাদক কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কি না, তা নয়; বরং মানুষকে আসক্তি থেকে ফেরানো, চিকিৎসা দেওয়া, পুনর্বাসন করা এবং পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর হচ্ছে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্যভিত্তিক চিকিৎসা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের মধ্যে কী ভারসাম্য থাকা উচিত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন।

দারিদ্র্য ও সম্পদের অসম বণ্টন

যুক্তরাষ্ট্রের জনগণনার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির সরকারি দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল ৩ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ; সরকারি দারিদ্র্যের হার ছিল ১০.২ শতাংশ। একই বছরের সম্পূরক দারিদ্র্য পরিমাপের হার ছিল ১৩.১ শতাংশ। দ্বিতীয় পরিমাপটি কর, সরকারি সহায়তা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত ব্যয় এবং আবাসনের আঞ্চলিক ব্যয়ের মতো বিষয় বিবেচনায় নেয়। তাই দুটি সূচকের হিসাব এক নয়।

দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানেই প্রত্যেকের অবস্থা অভিন্ন নয়। কেউ কর্মরত হয়েও পর্যাপ্ত আয় করতে পারেন না, কেউ চিকিৎসা বা বাসাভাড়ার ব্যয়ে বিপর্যস্ত হন, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব বা পারিবারিক সংকটে পড়েন। সরকারি দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা মানুষেরও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে অসুবিধা হতে পারে। ফলে শুধু একটি দারিদ্র্য সূচক দিয়ে মানুষের সামগ্রিক আর্থিক নিরাপত্তা পরিমাপ করা যায় না।

সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য আরও গভীর একটি প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সেন্ট লুইস ফেডারেল রিজার্ভ ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকের হিসাব তুলে ধরে জানায়, সম্পদের হিসাবে শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে ছিল মোট পারিবারিক সম্পদের ৬৭.২ শতাংশ। বিপরীতে, নিচের ৫০ শতাংশ পরিবারের হাতে ছিল মাত্র ২.৫ শতাংশ।

এই ব্যবধানের অর্থ হলো, জাতীয় সম্পদ বিপুল হলেও তার মালিকানা সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। ধনী পরিবারের সম্পদের বড় অংশ শেয়ার, ব্যবসা, বাড়ি ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদে বিনিয়োজিত থাকে; অন্যদিকে নিম্নসম্পদশালী পরিবারের কাছে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হতে পারে। ফলে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা আর্থিক সংকটের অভিঘাত সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও শ্রেণিভেদে আলাদা হয়।

তবে সম্পদে বৈষম্য থাকা মানেই দেশের প্রত্যেক দরিদ্র মানুষ সম্পূর্ণ অসহায় কিংবা প্রত্যেক ধনী মানুষ অন্যায্যভাবে সম্পদ অর্জন করেছেন—এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। আসল প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি সাধারণ মানুষের আয়, সঞ্চয়, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক গতিশীলতার সুযোগ কতটা বাড়াচ্ছে এবং বৈষম্য কমাতে কী ধরনের নীতি কার্যকর হচ্ছে।

চল্লিশ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ: বিপদের সংকেত, নাকি অর্থনৈতিক শক্তির আরেক দিক?

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের জয়েন্ট ইকোনমিক কমিটির ২০২৬ সালের অক্টোবরের ঋণবিষয়ক হালনাগাদ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর দেশটির মোট ফেডারেল ঋণ ছিল প্রায় ৪০.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জনগণের হাতে থাকা ঋণ ছিল ৩২.৪৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং সরকারি বিভিন্ন হিসাবের মধ্যে আন্তঃসরকারি ঋণ ছিল ৭.৮২ ট্রিলিয়ন ডলার।

ঋণকে অবশ্যই তার ধরন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে হবে। একটি দেশের মোট ঋণ এবং তার এক বছরের জিডিপি একই ধরনের পরিমাপ নয়। ঋণ হলো জমে থাকা দায়ের পরিমাণ; জিডিপি হলো এক বছরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মূল্য। তাই শুধু দুটি সংখ্যার তুলনা করে কোনো দেশের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

তবে ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকলে এবং সুদ পরিশোধে সরকারি আয়ের ক্রমবর্ধমান অংশ ব্যয় হলে তা ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করে। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাজেট ঘাটতি ছিল প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৫.৯ শতাংশের সমান। একই অর্থবছরে সরকারি ঋণের নিট সুদ পরিশোধ প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য খাতে ভবিষ্যৎ ব্যয়ের জন্য বাজেটের নমনীয়তা কমতে পারে। তবে ঋণের স্থায়িত্ব নির্ভর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর-আয়, সুদের হার, ঋণের মেয়াদ, সরকারি ব্যয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও।

যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মুদ্রা, গভীর আর্থিক বাজার এবং মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের বৈশ্বিক চাহিদা দেশটিকে অনেক দেশের তুলনায় বেশি ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা দেয়। কিন্তু সেই সুবিধা সীমাহীন নয়। ঋণ বেশি হওয়া মানেই দেশটি দরিদ্র—এ কথা যেমন ভুল, তেমনি বিশাল অর্থনীতি আছে বলে ঋণের ঝুঁকি নেই—এ ধারণাও ভুল।

অস্ত্র ব্যবসা: অর্থনীতির ভিত্তি, নাকি প্রভাবশালী একটি খাত?

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শিল্প বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় ও প্রভাবশালী খাত। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট—এসআইপিআরআই—এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১–২০২৫ সময়ে বৈশ্বিক প্রধান অস্ত্র রপ্তানির ৪২ শতাংশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী ছিল। আগের পাঁচ বছরের তুলনায় দেশটির অস্ত্র রপ্তানির পরিমাণও বেড়েছে।

অস্ত্র উৎপাদন ও রপ্তানি থেকে কোম্পানিগুলো আয় করে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ হয় এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক শক্তিশালী হয়। কিন্তু এর পাশাপাশি অস্ত্র বিক্রির নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। কোন দেশে অস্ত্র বিক্রি হচ্ছে, সেই অস্ত্র কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হচ্ছে কি না এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষতির ঝুঁকি কতটা—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রধান উৎস অস্ত্র ব্যবসা—এ দাবি সঠিক হবে না। দেশটির অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সেবা খাত, প্রযুক্তি, অর্থায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য, উৎপাদন, আবাসন, কৃষি এবং অন্যান্য কার্যক্রম। অস্ত্র শিল্প কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সমগ্র অর্থনীতির সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

অন্যদিকে, অস্ত্র রপ্তানিতে শীর্ষস্থান থাকা দেশটির বৈদেশিক নীতি নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ তৈরি করে। মানবাধিকার ও শান্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির ক্ষেত্রে একই নৈতিক মানদণ্ড কতটা প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি রাখে।

মানবাধিকার ও বৈদেশিক নীতির দ্বৈত মানদণ্ডের বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক বক্তব্য দিয়ে আসছে। দেশটির সংবিধান, আদালত, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বহু ক্ষেত্রে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করে। এসব প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও রাষ্ট্রকে একমাত্রিকভাবে বর্ণনা করা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

তবে বৈদেশিক নীতিতে মানবাধিকার ও নিরাপত্তার অগ্রাধিকারের সংঘাত বহুবার বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সামরিক অভিযান, মিত্ররাষ্ট্রকে অস্ত্র সহায়তা, নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতে অবস্থান নিয়ে সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র সব দেশের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করে না। নির্দিষ্ট ঘটনায় এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট নীতি, সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং সরকারি ব্যাখ্যা আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হবে।

কোনো সরকারকে ‘খুনি’ বা ‘সন্ত্রাসীদের মদদদাতা’ হিসেবে সাধারণভাবে আখ্যায়িত করা তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং নির্দিষ্ট ঘটনা, সিদ্ধান্ত, অস্ত্র বা অর্থ সহায়তার প্রমাণ, আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং আদালতের সিদ্ধান্ত থাকলে তা সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করা উচিত। রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করার অর্থ পুরো দেশের নাগরিকদের দায়ী করা নয়।

মানবাধিকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে শুধু অন্য দেশের আচরণের সমালোচনার ওপর নয়; নিজের দেশের নীতি, মিত্রদের আচরণ এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রেও একই নীতির প্রয়োগের ওপর।

বিমানের টিকিটের উচ্চমূল্য ও অতিরিক্ত ফি

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানযাত্রা নিয়ে যাত্রীদের একটি বড় অভিযোগ হলো, টিকিটের মূল ভাড়ার বাইরে লাগেজ, আসন নির্বাচন, অতিরিক্ত পায়ের জায়গা, খাবার, পরিবর্তন বা অন্যান্য সেবার জন্য আলাদা মূল্য দিতে হয়। ফলে প্রথমে বিজ্ঞাপিত ভাড়া এবং যাত্রীর শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করা মোট অর্থের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি জবাবদিহি দপ্তর—গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস (জিএও)—এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান সংস্থাগুলো সময়ের সঙ্গে অনেক সেবাকে মূল ভাড়া থেকে আলাদা করে অতিরিক্ত ফি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ফলে শুধু মূল ভাড়া দিয়ে বিভিন্ন সময়ের টিকিটের মূল্য তুলনা করলে যাত্রীর প্রকৃত ব্যয় বোঝা কঠিন হতে পারে।

তবে সব বিমান সংস্থা একইভাবে ফি নেয় না; কিছু ভাড়ায় লাগেজ বা আসন-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকে, আবার কিছু ক্ষেত্রে যাত্রী নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা বেছে নিতে পারেন। এই ব্যবস্থা কোনো কোনো যাত্রীর জন্য কম ভাড়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদের জন্য মোট খরচ বাড়াতে পারে।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো, ভাড়ার তথ্য কতটা স্বচ্ছ, অতিরিক্ত ফি আগে থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে কি না এবং বাজারে প্রতিযোগিতা যাত্রীদের জন্য বাস্তব সুবিধা তৈরি করছে কি না। টিকিটের দাম বেশি হলেই একটি দেশ দরিদ্র—এমন সিদ্ধান্ত আসে না; কিন্তু উচ্চ ব্যয় ও অস্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা ভোক্তার স্বার্থের প্রশ্ন তৈরি করে।

তাহলে ধনী হওয়ার প্রকৃত অর্থ কী?

ধনী দেশ বলতে সাধারণত এমন দেশকে বোঝানো হয়, যার উৎপাদনক্ষমতা, মাথাপিছু আয়, সম্পদ, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী। এই মানদণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশগুলোর একটি। দেশটির অর্থনীতি, বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং আর্থিক বাজারের শক্তি বাস্তব; গৃহহীনতা বা দারিদ্র্যের অস্তিত্ব দিয়ে এসব অর্জন অস্বীকার করা যায় না।

কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু মোট উৎপাদন বা বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক প্রশ্নগুলো আড়ালে থেকে যায়। নাগরিকেরা নিরাপদ বাসস্থান পাচ্ছেন কি না, চিকিৎসা ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকার কতটা, কর্মসংস্থান থেকে অর্জিত আয় দিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন সম্ভব কি না, সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ কতটা বিস্তৃত এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর কী বোঝা চাপাচ্ছে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

রাষ্ট্রের নৈতিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে ধনী হতে পারে, কিন্তু তার বৈদেশিক নীতি, সামরিক সহায়তা কিংবা মানবাধিকার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর সমালোচনা থাকতে পারে। অর্থনৈতিক সম্পদ ও নৈতিক বৈধতা একে অন্যের বিকল্প নয়।

ধনী দেশ, কিন্তু কার জন্য কতটা সমৃদ্ধ?

যুক্তরাষ্ট্রকে ধনী দেশ বলা যায় কি না—এর উত্তর নির্ভর করে ‘ধনী’ শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। সামগ্রিক অর্থনীতির আকার, প্রযুক্তিগত শক্তি, আর্থিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রভাবের বিচারে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ধনী। কিন্তু দেশটির সম্পদের বণ্টন, গৃহহীনতা, দারিদ্র্য, মাদকজনিত মৃত্যু, স্বাস্থ্য ও আবাসন ব্যয় এবং রাষ্ট্রীয় ঋণের চাপ দেখায় যে জাতীয় সম্পদ থাকা আর প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।

দেশটির সামনে তাই দ্বিমুখী বাস্তবতা রয়েছে। একদিকে বিশাল অর্থনৈতিক সামর্থ্য, অন্যদিকে সেই সামর্থ্যকে সামাজিক নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতায় রূপান্তর করার চ্যালেঞ্জ। অস্ত্র রপ্তানি ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে মানবাধিকারের মানদণ্ড প্রয়োগের প্রশ্নও এর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িত।

সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ধনী নয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়া তথ্যসম্মত হবে না; আবার দেশটির বিপুল জিডিপিকে সব নাগরিকের সমৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে দেখানোও যথেষ্ট নয়। অধিকতর যথাযথ সিদ্ধান্ত হলো—যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ধনী, কিন্তু তার সম্পদের বণ্টন, সামাজিক সুরক্ষা, ঋণের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক নীতির নৈতিক সামঞ্জস্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। একটি দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি বিচার করতে হলে শুধু তার কত সম্পদ আছে, তা নয়; সেই সম্পদ দিয়ে কত মানুষের জীবন নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় করা যাচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।

সূত্র: বিশ্বব্যাংক, এসআইপিআরআই, যুক্তরাষ্ট্রের হাউজিং অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট বিভাগ, যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণনা ব্যুরো, সেন্ট লুইস ফেডারেল রিজার্ভ, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট ইকোনমিক কমিটি ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি জবাবদিহি দপ্তর- এর ওয়েবসাইট।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন