ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্র দেশগুলোতে অস্ত্র সরবরাহ পিছিয়ে দিতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা যেমন চাপে পড়ছে, তেমনি রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতের ক্ষেত্রে নতুন হিসাব কষার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সিনিয়র মার্কিন ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইরানে হামলা এবং পাল্টা হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ উচ্চমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব অস্ত্রের অনেকগুলো তৈরিতে জটিল ও নির্ভুল প্রযুক্তি প্রয়োজন হয় এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে অস্ত্রভাণ্ডার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
দুই বছরে ফিরবে না প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে ১ হাজার ৭০০টিরও কম।
উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন অস্ত্রভাণ্ডারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এমন প্রত্যাশা থেকে ট্রাম্প অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরুর পর ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পরও যুদ্ধের অবসান ঘটেনি। বরং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ আরো বাড়িয়েছে।
ইউরোপ-এশিয়ায় কমছে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা
ইরান যুদ্ধের জন্য ইউরোপ ও এশিয়া থেকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে মার্কিন বাহিনীর সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, সেনাদের মনোবল এবং সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়ছে।
বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলে উদ্বেগ বেশি। চীনের সম্ভাব্য তাইওয়ান অভিযান মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা মোতায়েন করে রেখেছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের সময় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে টমাহকসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া ও এশিয়ার অন্যান্য স্থান থেকেও শত শত উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অঞ্চলটি থেকে একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ও উন্নত প্রযুক্তির কয়েকটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারও ইরান যুদ্ধের সহায়তায় মোতায়েন করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনারাও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কারণ কিছু আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নজরদারি সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেনেও পড়েছে অস্ত্রসংকটের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রসংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে ইউক্রেনে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে এ বছর তার দেশ যে পরিমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে, তা ২০২৫ সালের তুলনায় তিনগুণ কমেছে।

একই সময়ে রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়ে চলেছে। ফলে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তুলনায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
একটি হামলার উদাহরণ দিয়ে জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার ছোড়া ২৮টি ক্ষেপণাস্ত্রের একটিও ইউক্রেন প্রতিহত করতে পারেনি। ওই হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হন। তার মতে, আরো বেশি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে নিহতদের অনেকের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাও এখন বিশ্বব্যাপী আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটের মধ্যে নিজেদের মজুত ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ইউক্রেনকে আরো ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানানো হলে ট্রাম্পও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদেরও ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।
রাশিয়া-চীন হিসাব কষছে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের এই দুর্বলতা রাশিয়া ও চীনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দুই দেশই বিভিন্ন প্রকাশ্য তথ্য, প্রতিরক্ষা বাজেট, অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাশিয়া ও চীনের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ইরান যুদ্ধে কিছু ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র—যেমন আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস) ও প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল—এর মজুতও অনেকটাই কমে গেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক টম কারাকোর ভাষায়, এই অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষয় প্রচলিত সামরিক প্রতিরোধ সক্ষমতার জন্য ‘এক প্রজন্মের বিপর্যয়’। তার মতে, অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে কয়েক বছর লাগবে—এ বিষয়টি রাশিয়া ও চীনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এশিয়ায় বাড়ছে মিত্রদের উদ্বেগ
অস্ত্রসংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর। এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যদি মনে করে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রচলিত অস্ত্রের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, তাহলে নিজেদের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তারা আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন তারা।
ইউরোপেও যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের দীর্ঘ অপেক্ষা মিত্র দেশগুলোকে বিকল্প সরবরাহকারীদের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের বাজার ও মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কেও পরিবর্তন আসতে পারে।

রাশিয়ার জন্য ‘সুযোগের জানালা’
রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করা কার্নেগি এনডাওমেন্টের বিশেষজ্ঞ দারা ম্যাসিকটের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের গত চার বছরেই রাশিয়া বুঝতে শুরু করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশার তুলনায় ধীরে অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে পারে। ইরান যুদ্ধ সেই ধারণাকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।
অন্যদিকে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক টড হ্যারিসন মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রসংকট তত গভীর হবে এবং দেশটির দুর্বলতার সুযোগ তত স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
রাশিয়ার একজন জনপ্রিয় যুদ্ধপন্থী ব্লগার আলেকজান্ডার কটসও মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার কমে যাওয়াকে ইউক্রেনের জন্য নেতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভুল-নির্দেশিত অস্ত্র যত কম থাকবে, ইউক্রেনে পৌঁছানো অস্ত্রের পরিমাণও তত কমবে।
সংকট অস্বীকার হোয়াইট হাউসের
তবে ট্রাম্প প্রশাসন অস্ত্রসংকটের খবরকে অস্বীকার করেছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে প্রেসিডেন্টের নির্দেশিত অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে।
তিনি আরো দাবি করেছেন, মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অস্ত্র তৈরি করছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেলও অস্ত্রসংকটের খবরকে ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট যখন যেখানে হামলার নির্দেশ দেবেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিপুল পরিমাণ তুলনামূলক কম উন্নত অস্ত্র থাকলেও উচ্চক্ষমতার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের মজুত দ্রুত পূরণ করা কঠিন। ফলে ইরান যুদ্ধের বর্তমান প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ইউরোপ, এশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশলেও এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক কৌশলগত চাপে ফেলছে, যার প্রভাব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বহু বছর থাকতে পারে। আর সেই সময়টিই রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য হয়ে উঠতে পারে নতুন সুযোগের জানালা।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


