আলোকচিত্র কেবল স্থির কোনো দৃশ্য নয়, বরং না-বলা গল্পের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। শখ থেকে পেশা এবং পেশা থেকে আত্মপরিচয়—আলোকচিত্রের এমনই এক শিল্পীর যাত্রার নাম খন্দকার নাইমা আলম। সব বাধা পেরিয়ে ‘ছবি কন্যা’ হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠেছেন নতুনদের অনুপ্রেরণা।
আলোকচিত্রের রঙিন জগতে আপনার পথচলার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
আমার এই যাত্রার গল্পটা একটু অন্যরকম। আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার জীবনসঙ্গী, যিনি নিজেও একজন স্বনামধন্য আলোকচিত্রী। শুরুতে কেবল তার কাজের জগৎটা বুঝতে এবং তার সঙ্গে ফটোগ্রাফি নিয়ে গল্প জমানোর আগ্রহ থেকেই ক্যামেরা হাতে নিই। কিন্তু সেই কৌতূহল কখন যে গভীর ভালোবাসায় রূপ নিল, তা আমি নিজেই বুঝতে পারিনি! ধীরে ধীরে অনুভব করলাম, ফটোগ্রাফি শুধু আমার শখ নয়, বরং এটি আমার নিজস্ব গল্প বলার ভাষা। সেই ভালোবাসা আর তাড়না থেকেই একসময় আলোকচিত্রকে পেশা হিসেবে বেছে নিই। আজ এটি কেবল আমার পেশাই নয়, আমার আত্মপরিচয় ও সৃজনশীলতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নারী হিসেবে আপনার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বা ছবি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলে?
নারী হিসেবে মানুষের আবেগ, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট বিষয়গুলো আমি হয়তো একটু ভিন্ন গভীরতা থেকে অনুভব করি। আমার কাছে একটি ছবি শুধু দৃশ্যগতভাবে সুন্দর হলেই চলে না, তার ভেতরে একটি জীবন্ত গল্প থাকা চাই। বিশেষ করে মানুষ ও সংস্কৃতির ছবি তোলার সময় আমি কেবল বাইরের রূপটা নয়, বরং তার ভেতরের না-বলা গল্পটা ধরার চেষ্টা করি। প্রত্যেক আলোকচিত্রীই তার নিজস্ব জীবনবোধ দিয়ে পৃথিবীকে দেখেন; নারী হিসেবে আমার সংবেদনশীলতা ও দৃষ্টিভঙ্গিও তাই আমার ফ্রেমে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রতিফলিত হয়।
মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নারী হিসেবে কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন এবং তা কীভাবে জয় করেছেন?
ফটোগ্রাফি এমন এক পেশা, যেখানে দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকতে হয়, ছুটতে হয় নানা প্রান্তে, মিশতে হয় বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে। শুরুতে একজন নারী হিসেবে কিছু সামাজিক ও পেশাগত ভ্রুকুটি তো ছিলই। তবে আমি কখনোই এগুলোকে নিজের সীমাবদ্ধতা হিসেবে মেনে নিইনি। বরং কাজের মান ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করেছি। আমি বিশ্বাস করি, একজন নারী যখন নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারেন, তখন সব বাধাই হার মানে। সেই জেদ আর স্বপ্ন থেকেই ফটোগ্রাফিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ছবি কন্যা’র (Chobi Konna Photography) জন্ম। এর মাধ্যমে আমি শুধু নিজের জন্যই নয়, বরং অন্যান্য নারী আলোকচিত্রীদের জন্যও একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক ক্ষেত্র তৈরি করতে চেয়েছি।
আপনার তোলা অসংখ্য ছবির মধ্যে কোন প্রজেক্টটি হৃদয়ের সবচেয়ে কাছাকাছি?
কাজের প্রয়োজনে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াই, অসংখ্য মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করি। তবে এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জের লাল কাচ তৈরির প্রজেক্টটি আমার মনের খুব কাছের। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না, বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমার লক্ষ্য ছিল কেবল সাধারণ কিছু ছবি তোলা নয়, বরং লাল কাচের রুক্ষতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য, বৈচিত্র্য এবং কারিগরদের জীবনের গল্পটা ফ্রেমে তুলে আনা। যখন কোনো কঠিন বিষয়কে নিজের কল্পনা অনুযায়ী সফলভাবে ক্যামেরায় ধারণ করা যায়, তখন সেই কাজের প্রতি আলাদা একটা মায়া জন্মে যায়। মুন্সীগঞ্জের ওই প্রজেক্টটি আমার কাছে ঠিক তেমনই এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
বর্তমানে নারী আলোকচিত্রীদের কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তা ও সম্ভাবনাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আগের চেয়ে এখনকার চিত্র অনেকটাই ইতিবাচক। ওয়েডিং, বেবি, স্টুডিও থেকে শুরু করে করপোরেট ফটোগ্রাফি—সব খাতেই নারীরা এখন বেশ দাপটের সঙ্গে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। তবে চ্যালেঞ্জ এখনো ফুরোয়নি। মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা, গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াত এবং সমাজের কিছু বাঁকা দৃষ্টিভঙ্গি এখনো নারীদের চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এরপরও আমি দারুণ আশাবাদী, কারণ প্রতিকূলতা পেরিয়ে অনেক নারীই এখন সাহসের সঙ্গে ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন। কাজের জায়গায় যদি নারীদের জন্য আরেকটু নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে এই পেশায় নারীদের সম্ভাবনা ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে।
নতুন যারা এই পেশায় আসতে চাইছেন তাদের কিংবা তরুণীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
নতুনদের প্রতি আমার প্রথম পরামর্শ হলো—ক্যামেরা ধরার আগে নিজের ‘চোখ’ তৈরি করুন। কেবল দামি ক্যামেরা থাকলেই ভালো ছবি হয় না। আলো চিনতে হবে, মানুষের গল্প পড়তে হবে, মুহূর্তকে অনুধাবন করতে হবে। আর মেয়েদের বিশেষ করে বলব—‘কে কী বলবে’ সেই ভয় ঝেড়ে ফেলে নিজের কাজে মন দিন। প্রচুর ধৈর্য রাখুন এবং নিজের কাজের নিজেই কঠোর সমালোচক হোন। ফটোগ্রাফিতে নিজের স্বতন্ত্র সিগনেচার তৈরি করতে সময় লাগে। তাই অন্যের সঙ্গে নয়, বরং নিজের গতকালের কাজের সঙ্গে আজকের প্রতিযোগিতা করুন। ফটোগ্রাফিকে কেবল পেশা নয়, ভালোবাসার জায়গা হিসেবেও আঁকড়ে ধরুন। আমার স্বপ্ন—আগামীতে আরো অনেক নারী ক্যামেরা হাতে তুলে নিক এবং নিজেদের স্বপ্নগুলো সত্যি করুক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

